ঢাকায় বিমসটেক সচিবালয়ের ১২ বছর পূর্তি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরলেন মহাসচিব


বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক) সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ১২তম বার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ঢাকার শেরাটন হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। অনুষ্ঠানে BIMSTEC-এর সাত সদস্য দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিমসটেকের মহাসচিব রাষ্ট্রদূত ইন্দ্র মণি পান্ডে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে সংগঠনটির অর্জন, ক্রমবর্ধমান ভূমিকা, সংস্কার কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। বক্তব্যের শুরুতে রাষ্ট্রদূত পান্ডে বিমসটেকের সাত সদস্য রাষ্ট্রের সরকার ও জনগণকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার বাংলাদেশ সরকারকে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ এবং ঢাকায় সচিবালয় সফলভাবে পরিচালনার জন্য ধন্যবাদ জানান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বিমসটেক (BIMSTEC) সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন দ্বিপাক্ষিক মতপার্থক্য ও উত্তেজনা সত্ত্বেও তারা আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে; তিনি পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অভিন্ন লক্ষ্যের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, “মতপার্থক্য যা-ই থাকুক না কেন, আসুন আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতার পথ থেকে সরে না আসি। আমাদের সেই দৃঢ়তা থাকতে হবে। পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অভিন্ন লক্ষ্যের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সফল করার লক্ষ্যে কঠিন চ্যালেঞ্জ, উত্তেজনা এবং জটিল আলোচনা সামলে নেওয়ার মতো দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা আমাদের থাকতে হবে।”

কবির জানান, আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশ সব সদস্য রাষ্ট্র ও সচিবালয়ের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করবে। এর লক্ষ্য হলো বিভিন্ন প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়া এবং পরবর্তী বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা; ২০২৭ সালে ঢাকায় এই সম্মেলন আয়োজনের কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের এই সমাবেশ অগ্রগতি পর্যালোচনা, নতুন অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং অভিন্ন আঞ্চলিক এজেন্ডার বিষয়ে আরও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে।
কবির বলেন, “বিমসটেককে সফল করতে হলে আমাদের দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার বিষয়ে আটকে না থেকে বরং সম্পৃক্ততার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে।”
প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বিমসটেক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আরও গতিশীল সেতুবন্ধন এবং আঞ্চলিক শান্তি, অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
কবির বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বিমসটেক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আরও গতিশীল সেতুবন্ধন এবং আঞ্চলিক শান্তি, অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী শক্তি হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে বিমসটেকের সকল সদস্য রাষ্ট্রের সরকার ও জনগণকে এই উপলক্ষ্যে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।

বিমসটেকের ঐতিহাসিক যাত্রার কথা স্মরণ করে মহাসচিব বলেন, ১৯৯৭ সালের ৬ জুন ব্যাংকক ঘোষণার মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডকে নিয়ে ‘বিস্টেক’ (BISTEC) নামে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটিতে পরবর্তীতে মিয়ানমার, ভুটান ও নেপাল যুক্ত হয়। এর মধ্য দিয়ে সংগঠনটি বর্তমান ‘বিমসটেক’ নাম ধারণ করে।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিমসটেক আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে নিজস্ব সনদের (Charter) আওতায় কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংগঠনটি ‘বিমসটেক ব্যাংকক ভিশন ২০৩০’ অনুসরণ করছে। ১৮টি খাতে সহযোগিতা সাতটি বিস্তৃত ক্ষেত্রে সংগঠিত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রদূত পান্ডে বলেন, রাজনৈতিক বিরোধ এড়িয়ে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিমসটেক তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামুদ্রিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে।
তিনি বিমসটেকের ক্রমবর্ধমান প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের কথাও তুলে ধরেন। বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রে বিশেষায়িত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলা এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা বিষয়ে বিমসটেক বিভিন্ন কনভেনশন সম্পন্ন করেছে। একই সঙ্গে প্রত্যর্পণ, মানবপাচার এবং সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তর সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক অর্জনের কথা উল্লেখ করে বিমসটেক মহাসচিব বলেন, বিমসটেকের সামুদ্রিক পরিবহন সহযোগিতা চুক্তি যেসব সদস্য রাষ্ট্র এটি অনুসমর্থন করেছে, তাদের জন্য কার্যকর হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিমসটেক সনদ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে সংগঠনটি আন্তর্জাতিক আইনি সত্তা লাভ করেছে এবং পর্যবেক্ষক ও নতুন সদস্য গ্রহণের জন্যও উন্মুক্ত হয়েছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিমসটেকের বিভিন্ন অংশীদারিত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (IFPRI), ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (IORA), ইউএন উইমেন, বিশ্বব্যাংক, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (ITU)।
বিমসটেক সচিবালয়ের ভূমিকা সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত পান্ডে বলেন, ঢাকাভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানটি আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন, শীর্ষনেতা ও মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সচিবালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি বলেন, গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নই বিমসটেকের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ কারণে বিমসটেককে আরও কার্যকর ও দক্ষ আঞ্চলিক সংগঠনে পরিণত করতে ‘এমিনেন্ট পারসন্স গ্রুপ’-এর সুপারিশের ভিত্তিতে সংস্কার ও পুনরুজ্জীবন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বক্তব্যে বিমসটেক সচিবালয় ঢাকায় hosting ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানান মহাসচিব। একই সঙ্গে ঢাকায় দায়িত্ব পালনরত বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্যও তিনি ধন্যবাদ জানান।
সমাপনী বক্তব্যে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার জন্য উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রদূত ইন্দ্র মণি পান্ডে বিমসটেকের আরও শক্তিশালী ও সফল ভবিষ্যৎ নির্মাণে অব্যাহত সহযোগিতার আহ্বান জানান।











