এআই-সৃষ্ট সহিংসতা থেকে নারীর সুরক্ষায় ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের হয়রানি, মানহানি ও অনলাইনে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মোকাবিলায় ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংলাপে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে আইন, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল ও এআই-সুবিধাপ্রাপ্ত নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলায় অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড তৈরি, আইনি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জোরদার, প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

সংলাপটি বাংলাদেশের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘ঢাকা ডায়ালগ’-এর অংশ। ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল আফ্রিকার ১০ম ডাকারে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ফোরামে এ প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে ডিজিটাল ও এআই-সৃষ্ট সহিংসতা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সংলাপের সঞ্চালনা করেন পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম। তিনি জানান, ঢাকা ডায়ালগের আওতায় রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রতিরোধ, তদন্ত ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে অভিন্ন ভাষা, মানদণ্ড ও স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকা তৈরির পাশাপাশি এআই-সৃষ্ট কনটেন্টের সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণে কাজ করা হবে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্টের যথাযথ লেবেলিং ও উৎস শনাক্তকরণের মতো বিষয়গুলোতে মানদণ্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে আইন প্রণয়ন ও পর্যালোচনা, পুলিশ-প্রসিকিউটর-বিচারকদের ডিজিটাল প্রমাণ ও এআই ফরেনসিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সহযোগিতা করা হবে।
সংলাপে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এমপি, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এমপি, সংসদ সদস্য ও প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী ব্যারিস্টার জাহরাত আদিব চৌধুরী এবং মায়ের ডাকের প্রতিষ্ঠাতা সানজিদা ইসলাম তুলী এমপি।
শামা ওবায়েদ ইসলাম ঢাকা ডায়ালগকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অনলাইনে নারীর নিরাপত্তার মতো বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ডিজিটাল পরিসরে সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও ভুক্তভোগী সহায়তা ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এআই-সক্ষম সহিংসতার তদন্ত ও বিচারে বিদ্যমান আইনি ও প্রমাণগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ক্ষতির প্রমাণ ও দায় নির্ধারণের জটিলতার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যারিস্টার জাহরাত আদিব চৌধুরী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে শুরু থেকেই নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির নকশার অংশ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্টের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাকে মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন।
সানজিদা ইসলাম তুলী ভুক্তভোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি এমন হেল্পলাইন ও অভিযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যেখানে সহায়তা পেতে ভুক্তভোগীদের একাধিক দপ্তরে ঘুরতে না হয়।
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা বিদ্যমান আইনি ঘাটতি, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট মোকাবিলা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তায় বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী ধাপে আগ্রহী কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্রকে ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ডায়ালগ’ হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড নিয়ে একটি প্রাথমিক রেফারেন্স ডকুমেন্ট তৈরির জন্য একটি কারিগরি কর্মদল গঠন করা হবে, যা পরবর্তীতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।











