ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে এভিয়েশন খাতকে শক্তিশালী আঞ্চলিক হাবে রূপান্তরে কাজ করছে সরকার: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত


২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তরের লক্ষ্যে দেশের এভিয়েশন খাতকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এভিয়েশন খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিমানবন্দর একটি দেশের প্রবেশদ্বার এবং রাষ্ট্রের আয়নার মতো। তাই বিমানবন্দরগুলোর পরিকল্পিত ও সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্যে এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে।

রবিবার (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাজধানীর ইউনাইটেড কনভেনশন হলে বণিক বার্তা আয়োজিত এভিয়েশন খাতের সম্ভাবনা, নীতিগত সংস্কার ও ভবিষ্যৎ করণীয়বিষয়ক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। কনক্লেভে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। এতে দেশের এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
বিমানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৪২ বছর পর সিভিল এভিয়েশন রুলস-১৯৮৪ সংশোধন করে নতুন ‘সিভিল এভিয়েশন রুলস-২০২৬’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। নতুন বিধিমালায় এভিয়েশন খাতকে ব্যবসা ও বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব করার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় বিধান রাখা হবে।
এয়ারলাইন্স প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারাই আমাদের মূল অংশীজন।’ বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং নতুন বিধিমালা প্রণয়নে এয়ারলাইন্সগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে বিমান রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত বিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, উড়োজাহাজের জটিল যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহলের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা নিরসনেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় একটি ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল এভিয়েশন খাত পেয়েছে। বিমানবন্দর ও বিমানসেবায় যাত্রী হয়রানির বিভিন্ন অভিযোগও ছিল। এসব হয়রানি কমানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সেবার মানোন্নয়নে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার্থে আন্তর্জাতিক মানের মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল (এমআরও) ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি উদ্যোগে বেসামরিক বিমানবন্দর স্থাপন এবং বিদ্যমান বিমানবন্দর সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া সহজীকরণেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতা কামনা করেন মন্ত্রী।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বণিক বার্তাসহ দেশের গণমাধ্যমগুলোকে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং দায়িত্বশীল ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে হলে বিমানবন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন, জাতীয় এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্য কেউ এসে বাংলাদেশের হয়ে কাজ করে দেবে না; নিজেদের নেতৃত্বেই এ খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের এভিয়েশন খাতকে এগিয়ে নিতে উড়োজাহাজের বহর বাড়ানো, নতুন রুট ও ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি, কার্গো ও ফ্রেইট সক্ষমতা বাড়ানো এবং এমআরও সুবিধা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের এভিয়েশন প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করে দক্ষ পাইলট, এয়ারলাইন ইঞ্জিনিয়ার ও গ্রাউন্ড স্টাফ তৈরি করতে হবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার যতটা সম্ভব ওপেন স্কাই নীতি বজায় রাখতে চায়। বাংলাদেশকে এমন একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যার মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হবে। তিনি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোকেও আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ও সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, টার্মিনাল-৩ নিয়ে সরকারের আলোচনা দ্রুতগতিতে এগিয়েছে এবং সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ ও দেশের মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে একটি ‘উইন-উইন’ চুক্তি নিশ্চিত করা হবে। সম্ভাব্যভাবে ডিসেম্বর মাসে টার্মিনালটির সফট ওপেনিং এবং আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। পূর্ণ সক্ষমতায় টার্মিনাল-৩ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহনের সুযোগ তৈরি করবে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, টার্মিনাল-৩ চালুর পর এর অপারেশনাল প্রস্তুতি, যাত্রী স্থানান্তর ব্যবস্থা ও অন্যান্য সেবা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন, জাপান ও কোরিয়ার সঙ্গে আকাশ যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি লো-কস্ট এয়ারলাইন অংশীদারিত্ব ও নতুন গেটওয়ে তৈরির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক পরিবেশকে আরও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। তিনি বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের নেতৃত্বে এ খাতের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কেএম মুজিবুল হক বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে ২০-২৪ মিলিয়ন যাত্রী এবং পাঁচ লাখ টন কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এখন এই সক্ষমতা কীভাবে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়, সেটিই মূল বিষয়। বর্তমানে দেশের এভিয়েশন বাজারের আকার ৫-৬ বিলিয়ন ডলার। এর মাত্র ২২ শতাংশ দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর দখলে। বিমান ভ্রমণ বাবদ প্রতিবছর প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ থাকা এ খাতের জিডিপিতে অবদান মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে দেশের এভিয়েশন বাজারের আকার ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হলে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। নীতিগত সহায়তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
উন্মুক্ত আলোচনায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এভিয়েশন খাত দেশের রাজস্ব বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ, আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা গেলে এ খাতের আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এতে বিদেশি যাত্রী আকর্ষণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও এভিয়েশন খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
কনক্লেভে এভিয়েশন খাতের বিদ্যমান সমস্যা, সম্ভাবনা, নীতিগত সংস্কার এবং এসব সমস্যা সমাধানে করণীয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা বিস্তারিত আলোচনা করেন।











