বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বাড়াতে আগ্রহী লিথুয়ানিয়া


বাংলাদেশ ও লিথুয়ানিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অংশীদারত্ব এবং দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের বিষয়ে একমত হয়েছে। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপ ও উচ্চপর্যায়ের সফর বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে সহযোগিতাবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর, ২০২৬) ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় দফার পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ (ফরেন অফিস কনসালটেশন—এফওসি) সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিপক্ষীয় বিষয়ক (পূর্ব ও পশ্চিম) সচিব রাষ্ট্রদূত ড. এম. নজরুল ইসলাম এবং লিথুয়ানিয়ার পক্ষে দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক উপমন্ত্রী ভিডমান্তাস ভার্বিকাস নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

পরামর্শ সভার শুরুতে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। উভয় দেশের প্রতিনিধিদলপ্রধান এতে স্বাক্ষর করেন। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ইনভেস্ট বাংলাদেশ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। দুই দেশ বিদ্যমান সম্পর্ককে নতুনভাবে গতিশীল করা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে পারস্পরিক উচ্চপর্যায়ের সফর আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়ের বিষয়ে একমত হয় উভয় পক্ষ।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং ওষুধশিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাতে বৈশ্বিক অবস্থান ও সক্ষমতার কথা লিথুয়ানিয়ার প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে লিথুয়ানিয়ার বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
দুই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক দ্রুত সম্পন্ন করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ পর্যালোচনার জন্য লিথুয়ানিয়ার বেসরকারি খাতের একটি অনুসন্ধানী প্রতিনিধিদল পাঠানোর আমন্ত্রণ জানায় বাংলাদেশ।
বৈঠকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, ইন্টারঅপারেবিলিটি, ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্র ব্যবস্থা (ই-আইডি), নিরাপদ তথ্য বিনিময়, উদ্ভাবন এবং ব্যবসায়িক অংশীদারত্বকে সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বাংলাদেশের ই-গভর্ন্যান্স ব্যবস্থার উন্নয়নে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুতির কথা জানায় লিথুয়ানিয়া। এ ছাড়া ই-রেজিস্ট্রেশন, ফিনটেক, গভটেক, ক্লাউড ও ডেটা সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, পরিবহনব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চপ্রযুক্তির চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধশিল্প এবং বায়োটেকনোলজি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
লিথুয়ানিয়ার উপমন্ত্রী এসব বিশেষায়িত খাতে তাঁর দেশের সক্ষমতা তুলে ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক অংশীদারত্বের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, লিথুয়ানিয়ার বেশ কয়েকটি ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানি ও বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগ অনুসন্ধান এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
বাংলাদেশ থেকে লিথুয়ানিয়ায় দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের সম্ভাবনাও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার এবং স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান দক্ষ জনশক্তির সক্ষমতা তুলে ধরে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ কর্মসূচির আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি, পরিচর্যা সেবা, নির্মাণ, আতিথেয়তা ও পর্যটন, কৃষি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তির চলাচল বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
লিথুয়ানিয়া এ ক্ষেত্রে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মিত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে। দুই দেশই দক্ষ কর্মীদের নিরাপদ ও বৈধ কর্মসংস্থানের পথ সুগম করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব জোরদারে শিক্ষা, ক্রীড়া, পর্যটন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং যুবসমাজের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
লিথুয়ানিয়ার উপমন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে লিথুয়ানিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নিয়মিত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে পর্যটন, সাংস্কৃতিক দল বিনিময় এবং দক্ষ ও আধা-দক্ষ পেশাজীবীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে কৃষি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, পর্যটন প্রসার, বিনিয়োগের উন্নয়ন ও সুরক্ষা এবং শিল্প খাতে সহযোগিতাবিষয়ক কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় দলিল দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ, পর্যটন ও শিল্প খাতে নতুন অংশীদারত্বের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁর দায়িত্ব পালনে সমর্থন দেওয়ার কথা জানান লিথুয়ানিয়ার উপমন্ত্রী।
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সভাপতিত্বের দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্ভাব্য সহযোগিতার আশাবাদও ব্যক্ত করে লিথুয়ানিয়া।
বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশকে সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় লিথুয়ানিয়া।
এ ছাড়া বাল্টিক অঞ্চলে লিথুয়ানিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০২৭ সালে যথাযোগ্যভাবে উদ্যাপনের বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। এ উদ্যাপনের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অর্জন তুলে ধরা এবং ভবিষ্যতে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
দুই দেশের প্রতিনিধিদল মনে করে, দ্বিতীয় দফার পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভা ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে তৃতীয় দফার পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভা আয়োজনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশ ও লিথুয়ানিয়ার এই উদ্যোগ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কূটনৈতিক যোগাযোগের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানভিত্তিক বহুমাত্রিক অংশীদারত্বে উন্নীত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।











