নতুন রাডার ও এটিসি টাওয়ার চালুর পর বদলে গেল এভিয়েশন খাতের চিত্র


ঢাকায় বসানো হয়েছে নতুন রাডার। এখন থেকে বাংলাদেশের আকাশসীমায় এলেই দিতে হবে রাজস্ব। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের কারণে এতদিন এই ব্যবস্থা চালু ছিল না। এসব সমস্যা কাটিয়ে দেশের আকাশসীমা এখন পুরোপুরি নিজেদের কব্জায়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ার এবং পূর্ণাঙ্গ রাডার ব্যবস্থা চালুর পর পাল্টে গেছে দেশের এভিয়েশন খাতের চিত্র।

পুরোনো জীর্ণদশা কাটিয়ে আকাশপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে গত ছয় মাসেই ফ্লাইওভার বা ওভারফ্লাই চার্জ বাবদ সরকারের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পর্যাপ্ত আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর রাডার ব্যবস্থার অভাব ছিল। বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন আকাশসীমার একটি বড় অংশ কার্যকর নজরদারির বাইরে থাকায় দেশের ওপর দিয়ে বিদেশি বিমান চলাচল করলেও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ফি বা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হতো না। এমনকি নামমাত্র বা দুর্বল কাঠামোর কারণে আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের পরোক্ষ দুর্বলতা ও পরনির্ভরশীলতা বজায় ছিল।
অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) এবং কমিউনিকেশন, নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স (সিএনএস) সিস্টেমের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই মূলত দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। পরবর্তীতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আধুনিক এটিসি টাওয়ার ও রাডার ব্যবস্থার উদ্বোধন করা হয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) এবং বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রযুক্তি চালুর পর থেকেই ওভারফ্লাই রাজস্ব আয়ের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু ওভারফ্লাই ফি বাবদই আয় হয়েছে রেকর্ড ৮০৫ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৩৩৮ কোটি টাকার ওপরে আয় হলেও, টাওয়ারটি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর কেবল জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসের ব্যবধানেই আয় ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসেই নিয়মিতভাবে গড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা রাজস্ব জমা হচ্ছে সরকারের খাতে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত পাঁচ দশকে দেশে যে অ্যানালগ ও সীমিত সক্ষমতার রাডার ব্যবহৃত হতো, তাতে বিদেশি বিমানগুলোর সঠিক রুট মনিটরিং করা দুরূহ ছিল। অনেক উড়োজাহাজ রাডার ফাঁকি দিয়ে বা কম নজরদারির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করত। যার আর্থিক ক্ষতি পোহাতে হতো দেশকে।
বর্তমানে ফ্রান্সের বিখ্যাত এভিয়েশন ও ডিফেন্স টেকনোলজি কোম্পানি ‘থেলস’-এর সঙ্গে জি-টু-জি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) ভিত্তিতে বাস্তবায়িত প্রায় ৯৪২ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি দেশের আকাশ নিরাপত্তায় বিপ্লব এনেছে। সিএএবির নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থার ফলে এখন দেশের আকাশসীমার এক ইঞ্চি জায়গাও আর নজরদারির বাইরে থাকছে না। বিদেশি যেকোনো বিমান দেশের ওপর দিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্র্যাকিং সিস্টেমে ধরা পড়ছে এবং নির্ধারিত ফি আদায় নিশ্চিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন রুটে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। আকাশসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এ খাত থেকে অর্জিত এই রাজস্ব দেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন ও স্থায়ী শক্তিশালী উৎস হিসেবে যুক্ত হয়েছে।











