বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শ্রমে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া


মালয়েশিয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে মালয়েশিয়া হাইকমিশন আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান। অনুষ্ঠানে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

স্বাগত বক্তব্যে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান বলেন, ৩১ আগস্ট ১৯৫৭ মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার ৬৯ বছর পূর্তি এবং ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩ মালয়েশিয়া গঠনের ৬৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার এবারের জাতীয় দিবস ও মালয়েশিয়া দিবসের মূল বার্তা হলো এমন একটি দেশ গড়ে তোলা, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল জনগণের কল্যাণ, অন্তর্ভুক্তি, ঐক্য ও অভিন্ন সমৃদ্ধির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়।
বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদী দর্শনের কথা তুলে ধরে হাইকমিশনার বলেন, জাতীয়তা, ভাষা, ধর্ম ও সীমান্তের পরিচয়ের আগে মানুষই সবার প্রধান পরিচয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কও কেবল দুই সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক। শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা, পর্যটক এবং বিশেষ করে বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীরা দুই দেশের মধ্যে এই মানবিক সেতু গড়ে তুলেছেন।
হাইকমিশনার বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ দশকের বেশি সময়ে তা বহুমাত্রিক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়াকে তিনি দুই দেশের সম্পর্কের প্রতি আস্থা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ। তবে এই অর্জনে সন্তুষ্ট না থেকে দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল গঠনের উদ্যোগ দুই দেশের বেসরকারি খাতের সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাইকমিশনার বলেন, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে মালয়েশীয় কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি রয়েছে। ভবিষ্যতে সেমিকন্ডাক্টর, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, উন্নত উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হজ ব্যবস্থাপনা, ইসলামি অর্থায়ন ও কৃষিসহ নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BMCCI) এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশি শিল্প ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা নিতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর কূটনীতিকদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব সফর বাংলাদেশে মালয়েশীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়েছে বলে জানান হাইকমিশনার।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেও মালয়েশীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, তাতে মালয়েশিয়া গঠনমূলক সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (RCEP) যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মালয়েশিয়ার সমর্থনের কথা তুলে ধরেন।
শ্রম ও শিক্ষা সহযোগিতার প্রসঙ্গে হাইকমিশনার বলেন, মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী দেশটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করছেন। পর্যটনকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়া ভ্রমণের আহ্বান জানান।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও দুই দেশের সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন হাইকমিশনার। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর মালয়েশিয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে মালয়েশিয়ার দৃঢ় অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, স্থায়ী শান্তি কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়েই অর্জন করা সম্ভব।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আবদুল মঈন খান বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পঞ্চম শতাব্দী থেকেই বঙ্গ ও মালয় অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। সে সময় মসলা বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলার মসলিন মালয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম ও পেনাংয়ের মধ্যে যোগাযোগসহ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান দুই অঞ্চলের সম্পর্ককে আরও গভীর করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে। তিনি ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মালয়েশিয়া সফর এবং ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফরের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মুক্ত বাণিজ্য, ওষুধ, জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, বৈদ্যুতিক যান, উন্নত উৎপাদন ও আধুনিক প্রযুক্তির মতো নতুন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ড. মঈন খান বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতায় দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া পারস্পরিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে শ্রম অভিবাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী নিরাপদ, স্বচ্ছ ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করে অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্রের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে, যাতে শ্রমিক ও চাকরিপ্রত্যাশীরা কোনোভাবে প্রতারিত বা শোষিত না হন।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করছেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বাংলাদেশে আরও বেশি মালয়েশীয় শিক্ষার্থী ও গবেষককে আসার সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
ড. মঈন খান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করলে তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য আরও কার্যকর হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে তিনি মালয়েশিয়ার সহযোগিতা কামনা করে বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মানবেতর পরিস্থিতিতে বসবাস করছে। এটি শুধু দুই দেশের মধ্যকার সমস্যা নয়, বরং একটি বড় মানবিক সংকট। এ সংকটের সমাধানে মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে দুই দেশের প্রতিনিধিরা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নিরাপদ শ্রম অভিবাসন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক বিনিময়, প্রযুক্তি, পর্যটন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত সংবর্ধনাটি বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক ও কার্যকর অংশীদারত্বে উন্নীত করার নতুন প্রত্যয়কে তুলে ধরে।











