ভিয়েতনামের জাতীয় দিবসে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করবার আহ্বান জানালো বাংলাদেশ


বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি ভিয়েতনামের বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ, কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রবিবার (৩০ আগস্ট, ২০২৬) ঢাকায় ভিয়েতনাম দূতাবাস আয়োজিত দেশটির ৮১তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ভিয়েতনামের জাতীয় দিবস ২ সেপ্টেম্বর উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান, বাংলাদেশ সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশে বসবাসরত ভিয়েতনামি নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।

শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম আগামী বছরগুলোতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ভিয়েতনামকে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি ওষুধ, কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্য আমদানির আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশি আলু ভিয়েতনামে রপ্তানির অনুমতি দেওয়ায় দেশটির সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভিয়েতনামের বাজারে বাংলাদেশের কৃষি ও উদ্ভিদজাত পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণে এটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য বাণিজ্য ও অ-বাণিজ্যিক বাধা দূর করার পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) নিয়ে আলোচনা করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ী, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ পর্যটন, ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভিয়েতনাম ভ্রমণ করেন। একইভাবে ভিয়েতনামের ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ বাংলাদেশে বসবাস করছেন। সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে এই মানুষে-মানুষে যোগাযোগ আরও বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আসিয়ান-এর সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার পাশাপাশি রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (RCEP) যোগদানের যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, তাতে ভিয়েতনামের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করে ঢাকা।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত নগুয়েন মান কুয়ং দুই দেশের ৫৩ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থনের মধ্য দিয়ে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়েছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আগামী বছরগুলোতে এ বাণিজ্য ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে দুই দেশ কাজ করছে। ২০২৩-২০২৭ মেয়াদের সরকারি পর্যায়ের চাল বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভিয়েতনামের ভিনাফুড-২ ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ টন চাল সরবরাহ করেছে বলেও জানান তিনি।
ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০২৫ সালে দেশটির জিডিপি প্রায় ৫১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ০২ শতাংশ। একই বছর দেশটির আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মোট পরিমাণ প্রায় ৯৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ভিয়েতনাম বর্তমানে ১৭টি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে নিবন্ধিত বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ছিল। একই বছর দেশটিতে ২ কোটি ১২ লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভিয়েতনামের স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা, বহুপাক্ষিকতা ও বৈচিত্র্যকরণের নীতি তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, বর্তমানে ভিয়েতনামের ১৯৫টি দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি ৩৮টি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে বিভিন্ন অংশীদারত্ব কাঠামো গড়ে তুলেছে।
প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের ‘ফোর নো’ নীতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে কোনো সামরিক জোটে না যাওয়া, কোনো দেশের বিরুদ্ধে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে অবস্থান না নেওয়া, ভিয়েতনামের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন না করা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি না দেওয়া।
অনুষ্ঠানে ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আগস্টে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সফলভাবে আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাঁকেও অভিনন্দন জানান তিনি।
রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জাতীয় বাজেট এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে ঘোষিত ‘৩আর’ কৌশলের প্রশংসা করেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ-ভিয়েতনাম সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিকভাবে এগিয়ে নিতে দূতাবাস দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে যাবে। একই সঙ্গে শিল্প, কৃষি, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর লক্ষ্যে নতুন এয়ার ট্রান্সপোর্ট এগ্রিমেন্টের আলোচনা চূড়ান্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। হ্যানয়-ঢাকা সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ আরও জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
এ সময় বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন শেষে নিজ দেশে ফিরে যেতে যাওয়া ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতকে তাঁর অবদানের জন্য অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেন।
অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ-ভিয়েতনাম বন্ধুত্বের ৫৩ বছরের সম্পর্ককে আরও গভীর ও বিস্তৃত করার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।











