রাশিয়ার মস্কোতে গ্লোবাল ডিজিটাল ফোরামে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশের ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল


রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় গ্লোবাল ডিজিটাল ফোরামে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশের ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। গত ৮ থেকে ১০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের আইটি উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা পেশাজীবীরা অংশ নিয়ে বৈশ্বিক ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হন।

‘Communicate. Connect. Create.’ স্লোগানে আয়োজিত এ ফোরামটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংলাপের মঞ্চ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সমান সুযোগের ভিত্তিতে ডিজিটাল সহযোগিতা জোরদার এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলাই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।

রুশ ফেডারেশন সরকারের উদ্যোগে ডিজিটাল উন্নয়ন, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ফোরামটির আয়োজন করে ‘ন্যাশনাল প্রায়োরিটিজ’ ও ‘সেন্টার ফর গ্লোবাল আইটি কো-অপারেশন’। মস্কো সরকার ছিল ফোরামের জেনারেল পার্টনার এবং পিএসবি ব্যাংক ছিল কৌশলগত অংশীদার। রাশিয়ার বৃহত্তম আইটি আয়োজন ‘ডিজিটাল সলিউশনস’-এর অংশ হিসেবে মস্কোর গোর্কি পার্কের ‘মেচতা’ ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয় এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এর আগে ২০২৫ সালের ৫ ও ৬ জুন নিঝনি নভগোরোদে প্রথম গ্লোবাল ডিজিটাল ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, তিন দিনের এ আয়োজনে ১১১টি দেশের ৭৩০ জন বিশেষজ্ঞসহ ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি অতিথি অংশ নেন। ৬০টিরও বেশি অধিবেশনে গোলটেবিল আলোচনা, বক্তৃতা, কর্মশালা ও উপস্থাপনার আয়োজন করা হয়। এতে রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী, ডিজিটাল উন্নয়নমন্ত্রী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার প্রধানসহ ৭০ জনেরও বেশি উচ্চপদস্থ রুশ ও আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা বক্তব্য দেন। ফোরামের ফাঁকে ১৫০টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পাশাপাশি দুই শতাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ফোরামের আলোচনায় গুরুত্ব পায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক নিয়মনীতি, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা, এআই নৈতিকতা, স্মার্ট সিটি, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা এবং গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন দেশের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়, নীতিগত সমন্বয় এবং উদ্ভাবনভিত্তিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে আসে।
বৈশ্বিক আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে ছিলেন মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন মুন্না, অঞ্জন চন্দ্র দাস, মোহাম্মদ সাবের শাহ, মো. শাহরিয়ার আজাদ ইভান, জান্নাতুল ফেরদৌস লুফিন, জান্নাতুল মাওয়া মিম, রাসেদুল হক, খান মোহাম্মদ নাকিব, রাহাত উদ্দিন, মো. আব্দুর রশীদ সোহাগ, মামুন শেখ, মো. এনামুল হক, গোলাম কিবরিয়া, মো. আবুবকর সিদ্দিক, মো. সাদ্দাম হোসেন রনি, এসএম সজিবুল ইসলাম, মোহাম্মদ ফয়সাল আকবর, মাজাদুর রহমান রবিন এবং আমজাদ হোসেন সামিম।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বিমান টিকিট, আবাসন ও ভিসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়া হয়। এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও শিক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ফোরামের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও আলোচক হিসেবে অংশ নেন। ৮ অক্টোবর ‘The Value of a Name: Domain as a Digital Asset’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় ডায়ানা হোস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খান মোহাম্মদ নাকিব বক্তব্য দেন। একই দিনে ‘Humans Need Humans: Trust in Media in the Age of AI’ শীর্ষক প্যানেলে ‘টকহোপ ইন্টিগ্রেটেড মডেল (টিএইচআইএম)’-এর স্বতন্ত্র গবেষক ও ডেভেলপার মো. সাদ্দাম হোসেন রনি আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
এ ছাড়া ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, এমপি; মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম; এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুহাম্মদ মুখলেসুর রহমান।
বাংলাদেশ-রাশিয়া প্রযুক্তি সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা
দ্বিতীয় গ্লোবাল ডিজিটাল ফোরামে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেশের তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল ব্যবসা, অনলাইন গণমাধ্যম, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
ফোরাম চলাকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রুশ সংস্থাগুলোর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এসব সমঝোতার আওতায় সম্ভাব্য সহযোগিতা কার্যকর হলে প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণের সুফল পেতে হলে আলোচনায় অর্জিত অভিজ্ঞতাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর, স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দুই দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ গড়ে তোলা জরুরি।











