বাংলাদেশের সঙ্গে জলবায়ু, সংস্কৃতি ও বিমান চলাচলে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী স্পেন: স্পেনের রাষ্ট্রদূত


বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বিমান চলাচল ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত গাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়াগা ওচোয়া দে চিনচেত্রু। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন খাতে আরও বিস্তৃত করতে চায় স্পেন। এ ক্ষেত্রে স্পেন সরকারের ২০২৬–২০২৯ মেয়াদের এশিয়া-প্যাসিফিক কৌশল দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরাটন ঢাকা হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে স্পেনের জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকায় অবস্থিত স্পেন দূতাবাস আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। এতে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন।

বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত গাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়াগা বলেন, বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে সুসম্পর্ক বিদ্যমান এবং দুই দেশের মধ্যে কোনো সংঘাতের ইতিহাস নেই। তবে এই সুসম্পর্ককে আরও কার্যকর ও বহুমাত্রিক অংশীদারত্বে রূপ দিতে নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের রপ্তানির চতুর্থ বৃহত্তম গন্তব্য স্পেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি রাজনীতি, সংস্কৃতি, বিমান চলাচল ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপারে স্পেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় বিমান চলাচল খাতের সহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, এ চুক্তি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, এয়ারবাস এবং ইউরোপীয় বিমান চলাচল শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশে স্প্যানিশ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারেও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রদূত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ডিটেক্স চেয়ার-এর মাধ্যমে স্প্যানিশ ভাষা শিক্ষার কার্যক্রম পরিচালনায় ইন্ডিটেক্স ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি স্পেন দূতাবাসের উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, গত এপ্রিলে কান্তোরিয়ার সংগীতানুষ্ঠানের পর এবার স্প্যানিশ পিয়ানোবাদক আলভারো কান্তালের পরিবেশনার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বরে স্পেনের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আরও একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ বিএনপিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। একই দিনে গণভোটে জনগণ জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষেও রায় দিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আবারও অগ্রগতির পথে যাত্রা শুরু করেছে। দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে স্পেনের সমর্থন থাকবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্পেনে বসবাসরত ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি নাগরিকের অবদানের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, তাঁদের দৈনন্দিন কর্মপ্রচেষ্টা দুই দেশের অর্থনীতি ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন সফল করতে স্পেন দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানের জন্যও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে, দেশটির সরকার ও জনগণকে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে জাতীয় দিবসের উষ্ণ শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও স্পেন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শান্তি, বহুপাক্ষিকতা এবং টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। স্পেনসহ ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে বিদ্যমান সুসম্পর্ককে নতুন গতি দেওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী স্পেন সরকার ও জনগণের প্রতি তাঁদের স্বাগত জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। স্পেন সরকারের প্রায় পাঁচ লাখ অভিবাসীর অবস্থান নিয়মিতকরণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এ ঐতিহাসিক অভিবাসন সংস্কার কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী উপকৃত হতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, সর্বশেষ অর্থবছরে স্পেনে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। স্পেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। তবে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে স্পেনের উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান মন্ত্রী।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা ও স্মার্ট কৃষিতে স্পেনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৃক্ষরোপণ, বন সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, টেকসই পানির ব্যবহার ও সার্কুলার অর্থনীতিতে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি, বিমান চলাচল এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে জাতীয় দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।











