ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদল শনিবার (৯ মে, ২০২৬) ঢাকার ক্রাউন প্লাজা এয়ারপোর্ট হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘ইউরোপ ডে ২০২৬’ উদযাপন করেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার। এছাড়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সহযোগী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ১৯৫০ সালের ৯ মে ঘোষিত ঐতিহাসিক শুমান ঘোষণা ইউরোপীয় সংহতির ভিত্তি স্থাপন করে এবং পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের মাস্ট্রিখ্ট চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরও সুসংহত হয়।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপ সহযোগিতা, পারস্পরিক আস্থা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির যে নতুন যাত্রা শুরু করেছিল, তা আজ বিশ্বে আঞ্চলিক সংহতি, স্থিতিশীলতা ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থনের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের ৩০তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বৃহৎ ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল মোতায়েন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ইইউর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও যৌথ দায়িত্বের ভিত্তিতে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব আরও সম্প্রসারণে আগ্রহী বলেও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সংযোগ বৃদ্ধি ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কের মতো বহুমাত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য এবং ‘এভরিথিং বাট আর্মস (EBA)’ সুবিধার জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ভবিষ্যতমুখী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী। পাশাপাশি ইইউর ‘গ্লোবাল গেটওয়ে ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় সবুজ জ্বালানি, টেকসই অবকাঠামো ও ডিজিটাল সংযোগে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার তাঁর বক্তব্যে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে ঢাকায় “ইউরোপিয়ান ভিলেজ” গড়ে তুলেছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের “Unity in Diversity”-এর প্রতিফলন।
তিনি বাংলায় বলেন, “স্বাগতম, বাংলাদেশ এবং আমাদের উন্নত EU-Bangladesh সম্পর্ককে।”
রাষ্ট্রদূত বলেন, গত এক বছরে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তন করেছে এবং বাংলাদেশ-ইইউ পার্টনারশিপ অ্যান্ড কোঅপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (PCA)-এর আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এই সম্পর্ককে আরও গভীর ও বিস্তৃত করা মানবাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির কৌশলগত পদক্ষেপ।
তিনি জানান, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” নিশ্চিত করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চলতি বছরের শেষ দিকে প্রথম বাংলাদেশ-ইইউ বিজনেস ফোরাম আয়োজন করবে।

অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের “Global Gateway Initiative”-এর অংশ হিসেবে “I Am the Future” শীর্ষক স্কিলস ক্যাম্পেইনও উদ্বোধন করা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের ডিজিটাল, সবুজ ও বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা করা হবে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হলেও আন্তর্জাতিক আইন, সার্বজনীন মূল্যবোধ, নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা, অভিবাসন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে থাকবে।

অনুষ্ঠানের শেষাংশে রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বাংলাদেশে কর্মরত ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি, অনারারি কনসাল ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান।
বর্ণাঢ্য এ আয়োজনে ইউরোপীয় খাবার, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনের বিভিন্ন প্রদর্শনী অতিথিদের আকৃষ্ট করে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।











