ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত ও অ্যাপোস্টলিক নুনসিও Archbishop Kevin S. Randall এর আয়োজনে বুধবার (৬ মে ২০২৬) রাজধানীতে হলি সি-ভ্যাটিকান দূতাবাসের জাতীয় দিবস ও পোপ Pope Leo XIV-এর পন্টিফিকেটে নির্বাচিত হওয়া উপলক্ষে এক কূটনৈতিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, পোপ নির্বাচনের ঘটনা শুধু আধ্যাত্মিক মাইলফলক নয়, বরং এটি বৈশ্বিক গুরুত্ব বহন করে। এটি পবিত্র ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা, হলি সি’র নৈতিক নেতৃত্ব এবং শান্তি, মানবিক সেবা ও মানব মর্যাদার প্রতি নতুন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ও হলি সি’র সম্পর্ক শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক সহমর্মিতার অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই অংশীদারিত্ব ধর্মীয় সম্প্রীতি, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং মানবকল্যাণে আমাদের অভিন্ন লক্ষ্যকে এগিয়ে নিচ্ছে।”
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের ক্যাথলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সামাজিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। সরকার এ অবদান গভীরভাবে স্বীকার করে।
তিনি স্মরণ করেন, গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অ্যাপোস্টলিক মিশনের উদ্যোগে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী আন্তঃধর্মীয় সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববিষয়ক সম্মেলনের কথা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করবে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার “বাংলাদেশ ফার্স্ট” দর্শনের আলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও সম্প্রীতিময় সমাজ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, “ধর্ম ব্যক্তির, আর রাষ্ট্র সবার”—এই নীতির ভিত্তিতেই সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও তিনি উদ্ধৃত করেন—“আমরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান একসঙ্গে লাখো প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন করেছি। তাই এই স্বাধীন বাংলাদেশ আপনার, আমার, আমাদের সবার।”
সংখ্যালঘু ও নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বিষয় তদারকিতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী নিয়োগের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি তথ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় যোগাযোগ নীতি ও গণমাধ্যম কার্যক্রমে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি, নৈতিক মূল্যবোধ ও বৈচিত্র্য উদযাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান।
বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানব মর্যাদা রক্ষায় হলি সি-সহ সব অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অন্যদিকে বক্তব্যে অ্যাপোস্টলিক নুনসিও Archbishop Kevin S. Randall বলেন, “যুদ্ধ বিভক্ত করে, আশা একত্রিত করে; অহংকার পদদলিত করে, ভালোবাসা মানুষকে উন্নত করে”—পোপ লিও’র এই আহ্বান আজকের বিশ্বে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, ভ্যাটিকান দূতাবাসগুলো সামরিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে কাজ করে না; বরং শান্তি, সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানব মর্যাদা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। এমনকি যুদ্ধ বা কূটনৈতিক বিরোধের মধ্যেও ভ্যাটিকান নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রেখে সংলাপ ও শান্তির পথ খোঁজে।

আর্চবিশপ কেভিন এস. র্যান্ডাল বলেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মানবিক সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ক্যাথলিক চার্চ। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে তারা নিরবে মানবকল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি এক আবেগঘন উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, এক আরব মুসলিম রাজা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতি সম্মান জানিয়ে পোপ Pope Francis-কে গোপনে অনুদান দিয়েছিলেন। পরে সেই অর্থ বাংলাদেশে কারিতাসের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় ব্যয় করা হয়। তিনি বলেন, “একজন মুসলিম রাজা আল্লাহর নামে দান করলেন, একজন খ্রিস্টান পোপ সেই অর্থ মুসলিম রোহিঙ্গাদের সহায়তায় পাঠালেন—এটি ধর্মীয় সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ।”
বাংলাদেশে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সামাজিক অবদানের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, দেশে প্রায় চার লাখ খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর জন্য ক্যাথলিক চার্চ পরিচালনা করছে পাঁচটি হাসপাতাল, ৮০টি মেডিকেল ক্লিনিক, ১২টি মাতৃসেবা কেন্দ্র ও চারটি নার্সিং স্কুল। এছাড়া রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, ২২টি কলেজ ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৯১টি স্কুল ও জুনিয়র হাইস্কুল, ২১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৪১৩টি কিন্ডারগার্টেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আমরা খ্রিস্টানদের চেয়ে বেশি মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছি। ধর্ম, বর্ণ বা মতাদর্শের ভেদাভেদ ছাড়াই মানবকল্যাণে কাজ করাই আমাদের লক্ষ্য।”
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রসঙ্গে হলি সি’র পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “ভয়মুক্ত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেশের জন্য এক গৌরবময় অধ্যায়। এটি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছে এবং এখন আমরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রত্যাশা করছি।”
তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র তখনই সুস্থ থাকে যখন তা নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। অন্যথায় তা সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য কিংবা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তির মুখোশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশ ও হলি সি’র মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।











