ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃ
বাংলাদেশে অবস্থিত আর্জেন্টিনা দূতাবাসের উদ্যোগে বুধবার (১৯ মে, ২০২৬) সন্ধ্যায় ঢাকায় আর্জেন্টিনার জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য কূটনৈতিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী, আব্দুল আওয়াল মিন্টু। তাঁর উপস্থিতি আয়োজনটিকে বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্য এনে দেয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “আর্জেন্টিনার জাতীয় দিবস এবং ২৫ মে ১৮১০ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবের ২১৬তম বার্ষিকী উদযাপনের এ আয়োজনে অংশ নিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করছি। এটি আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা, জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”
তিনি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আর্জেন্টিনা সরকার ও জনগণকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ও সংহতিকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদানকারী লাতিন আমেরিকার প্রথমদিকের দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনা অন্যতম। ১৯৭২ সালের ১৭ মে আর্জেন্টিনার স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি আজও গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তিনি জানান, চলতি বছর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৪তম বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের সময় ঢাকায় আর্জেন্টিনা দূতাবাস পুনরায় চালুর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার জনগণের মধ্যে ফুটবল একটি অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অলিগলি ও গ্রামে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ডিয়েগো ম্যারাডোনা-এর জাদুকরী ফুটবলের স্বপ্ন দেখেছে। বর্তমানে সেই আবেগ নতুনভাবে বহন করছেন লিওনেল মেসি। ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালে বাংলাদেশের রাস্তাঘাট আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকায় ছেয়ে যাওয়ার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বর্তমান পরিমাণ প্রায় ৮৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের জন্য সয়াবিন, গম, ভুট্টা, তুলা ও ভোজ্যতেলের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এছাড়া দুই দেশ বাণিজ্য, কৃষি, ক্রীড়া সহযোগিতা এবং জ্বালানি সরবরাহ চেইন নিয়ে বহুমুখী ব্যবসায়িক ফোরাম আয়োজনের দিকেও কাজ করছে।

এসময় বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো সেসা তাঁর বক্তব্যে প্রধান অতিথি ও উপস্থিত অতিথিদের ধন্যবাদ জানান এবং বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা সম্পর্ক আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “২১৬ বছর আগে বুয়েনোস আইরেস বিপ্লবের মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠা করি। সেই থেকেই স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনা আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি। আজ আমরা শুধু স্বাধীনতা নয়, বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার বন্ধুত্বও উদযাপন করছি।”
তিনি জানান, চলতি বছর বাংলাদেশ বুয়েনোস আইরেসে পুনরায় দূতাবাস চালু করতে যাচ্ছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশে প্রধানত সয়াবিন তেল, আটা, গম, ভুট্টা ও তুলা রপ্তানি হয়। পাশাপাশি ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মতো উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত ফার্মা এক্সপোতে আর্জেন্টিনায় উৎপাদিত অত্যাধুনিক ভেন্টিলেটর প্রদর্শিত হতে দেখেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকেও আর্জেন্টিনায় তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। ন্যাটকো ও ইন্ডিগো ফ্যাশনের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে আর্জেন্টাইন আমদানিকারকদের সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি এবারের একুশে বইমেলায় আর্জেন্টাইন লেখকদের বেশ কয়েকটি বইয়ের বাংলা অনুবাদ দেখে আনন্দ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার সম্পর্ক হয়তো অনেক সময় প্রচারের আলোয় আসে না, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এটি ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে।
তিনি বলেন, “আর্জেন্টিনা ঢাকায় দূতাবাস থাকা দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দূরের দেশ—প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এই দূরত্ব সত্ত্বেও দুই তরুণ বাংলাদেশি সম্প্রতি এক মাসের বেশি সময় আর্জেন্টিনা ভ্রমণ করেছেন এবং তাঁদের ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের চোখে আর্জেন্টিনাকে তুলে ধরছেন।”
এসময় তিনি ইউটিউবার সালাহ উদ্দিন সুমন ও নিলয় উমাথ বিশ্বাসকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাঁদের আর্জেন্টিনা ভ্রমণ নিয়ে নির্মিত একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক, বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আয়োজনটি বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার এক তাৎপর্যপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়।











