কপ৩১ সামনে রেখে প্রতিবছর নেগোশিয়েটরদের প্রশিক্ষণ দেবে সরকার


আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দক্ষ নেগোশিয়েটর গড়ে তুলতে প্রতি বছর জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন (কপ) শুরুর আগে বিশেষ প্রশিক্ষণ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেগোশিয়েটরদের নেতৃত্বে বিষয়ভিত্তিক দল গঠন করে সেখানে সহযোগী সদস্য যুক্ত করার নতুন পদ্ধতি চালু হচ্ছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের দক্ষ আলোচক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে (বিআইআইএসএস) দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ডেলিগেশন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম–ইউএনএফসিসিসি কপ৩১’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে। ২৭ ও ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচি ছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের নেগোশিয়েটরদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কপের আলোচনা প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আয়োজিত প্রথম আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রশিক্ষণ।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ (এনআইইসিসি) আয়োজিত এ কর্মসূচির কৌশলগত অংশীদার ছিল দ্য বাংলাদেশ ডায়ালগ ফাউন্ডেশনের জলবায়ুবিষয়ক উদ্যোগ ক্লাইমা। কর্মসূচির সার্বিক সমন্বয় ও সহযোগিতা ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দেয় ক্লাইমা।
এতে সহযোগী অংশীদার হিসেবে যুক্ত ছিল বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশন, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (গেইন), ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যাট লোকাল লেভেল (কল), হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), সেভ দ্য চিলড্রেন এবং নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নাকম)। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও রিসোর্স পারসনরা প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
কর্মসূচির কার্যকারিতা বিবেচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন থেকে প্রতি বছর কপ সম্মেলনের আগে এ ধরনের প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ নেগোশিয়েটরদের নেতৃত্বে বিষয়ভিত্তিক দল গঠন করা হবে। এসব দলে সহযোগী সদস্য হিসেবে নতুন আলোচকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে তাঁরা অভিজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
আয়োজকদের মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ নেগোশিয়েটর তৈরি করা সম্ভব হবে।
২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ। সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মনিরা সুলতানা। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নাকমের নির্বাহী পরিচালক ড. এস. এম. মুনজুরুল হান্নান খান, বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার, বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব কোঅপারেশন লিসা-তানিতা গ্রেমিঙ্গার এবং ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের প্রতিনিধি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন) ড. সাইমুম পারভেজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও শুভেচ্ছা জানান এবং কর্মসূচির সাফল্য কামনা করেন।
দুই দিনের প্রশিক্ষণে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদ (ইউএনএফসিসিসি) ও প্যারিস চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিক আলোচনা প্রক্রিয়া, কপ৩১-এর অগ্রাধিকার, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, সহনশীলতা, ক্ষয়ক্ষতি, প্রশমন, কার্বন বাজার এবং ন্যায্য রূপান্তর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি জলবায়ু কূটনীতি, কৌশলগত জোট গঠন, বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থান নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
প্রশিক্ষণে বাংলাদেশের জলবায়ু আলোচকদের একটি সমন্বিত জাতীয় দল হিসেবে কাজ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় অবস্থান তৈরি, দেশের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং কোন কোন বিষয়ে সমঝোতা সম্ভব ও কোন বিষয়ে আপস করা যাবে না, তা স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট (এলডিসি), জি৭৭ ও চীন, আঞ্চলিক অংশীদার এবং অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ নয়, বরং আলোচনার সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখা এবং বাংলাদেশের জন্য বাস্তব সুফল অর্জনকেই সাফল্যের মূল মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।
২৮ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ, যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যাডভাইজার এ এস এম মারজান নূর, যুগ্মসচিব মনিরা সুলতানা এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনকুল ইসলাম।
সমাপনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা দিতে প্রস্তুত করা ‘দ্য ক্লাইমেট নেগোশিয়েটরস গাইড’-এর আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন।
সমাপনী বক্তব্যে পূর্বানুমানযোগ্য ও সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজনের বৈশ্বিক লক্ষ্যের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার তহবিলের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
আয়োজকরা মনে করেন, এ প্রশিক্ষণ শুধু কপ৩১-এর প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করবে। নিয়মিত জ্ঞান বিনিময়, কারিগরি সমন্বয় এবং দক্ষ নেগোশিয়েটরদের স্থায়ী জাতীয় পুল গড়ে তোলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণ, ঐকমত্য গঠন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমে নেতৃত্বের সক্ষমতা আরও জোরদার হবে।











