ঢাকায় আলজেরিয়ার ৭২তম বিপ্লব বার্ষিকী উদযাপন, জ্বালানি ও বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার


বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার এবং জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ঢাকায় উদযাপিত হয়েছে আলজেরিয়ার ৭২তম মহান স্বাধীনতা বিপ্লব বার্ষিকী। এ উপলক্ষে রোববার (১ নভেম্বর, ২০২৬) সন্ধ্যায় রাজধানীর লে মেরিডিয়ান ঢাকার স্কাই বলরুমে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশে অবস্থিত আলজেরিয়ার দূতাবাস।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত ড. আবদেলওয়াহাব সাইদানি। তাঁর সঙ্গে অনুষ্ঠানের আয়োজন ও অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান মিসেস মেরিয়েম সাইদানি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং বাংলাদেশে বসবাসরত আলজেরীয় কমিউনিটির সদস্যরা অংশ নেন।
বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত ড. আবদেলওয়াহাব সাইদানি ১৯৫৪ সালের ১ নভেম্বর শুরু হওয়া আলজেরিয়ার ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রামের বীর শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ১৩২ বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার এই বিপ্লব শুধু দেশটির স্বাধীনতা অর্জনের পথ তৈরি করেনি, বরং আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

এ বছরের স্মরণীয় প্রতিপাদ্য ‘নভেম্বর ১: দেশের স্মৃতি ও উম্মাহর ভবিষ্যৎ’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, সার্বভৌমত্ব, সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিন ও পশ্চিম সাহারার জনগণের ন্যায্য অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি আলজেরিয়ার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
আলজেরিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেবুনের নেতৃত্বে দেশটি অর্থনীতির বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের বাইরের রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, খনিজ সম্পদ, কৃষি, আবাসন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ-আলজেরিয়া সম্পর্ক প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সংহতি রয়েছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আলজেরিয়া প্রথম আরব দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। তিনি জ্বালানি, তেল ও গ্যাস, ওষুধশিল্প, তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, জাহাজ নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের আলজেরিয়া সফরকে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আলজেরিয়ার সরকার ও জনগণকে দেশটির মহান মুক্তি বিপ্লবের ৭২তম বার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, স্বাধীনতার সংগ্রামে বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার অভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক, শিল্পপণ্য, খাদ্যপণ্য, সিরামিক ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে আলজেরীয় বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। একইভাবে আলজেরিয়ার কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের দেশটিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান তিনি।
আলজেরিয়ার তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে মন্ত্রী জ্বালানি প্রযুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার মধ্যে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। গত ২০ থেকে ২২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের মন্ত্রিপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের আলজেরিয়া সফরকালে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সফরে আলজেরীয় সরকারের আতিথেয়তা ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে বাস্তব অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপান্তরের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ওষুধশিল্প ও শিল্পোন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চেতনা পুনর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। বক্তব্যের শেষাংশে রাষ্ট্রদূত ড. আবদেলওয়াহাব সাইদানি বলেন, ‘আলজেরিয়া দীর্ঘজীবী হোক, বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক, বাংলাদেশ-আলজেরিয়া বন্ধুত্ব অটুট থাকুক।’











