বাংলাদেশে নিট এফডিআই বেড়েছে ১২.৭৮ শতাংশ, প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ের


বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২.৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪৬.৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য প্রান্তিকে নিট পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ৫৫.০৮ শতাংশ বেড়ে ২৬০.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। দেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্জিত মুনাফা পুনরায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়টি এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে নতুন ইকুইটি মূলধন বিনিয়োগে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে নিট ইকুইটি মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭৭.৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৭৭ শতাংশ কম। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে চাপ তৈরি হয়েছে।
এদিকে, নিট আন্তঃকোম্পানি ঋণপ্রবাহ ৮৫.১৭ শতাংশ কমে ৮.৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ খাতে মোট ৩৩৩.৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণপ্রবাহ এলেও বিদ্যমান ঋণের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিশোধের কারণে নিট প্রবাহ কমেছে।
ইপিজেডের বাইরে বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)-এর বাইরের খাতে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৭৫ শতাংশ বেড়ে ২৮০.৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ৪.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫.৩৩ শতাংশ কম। তবে আগের প্রান্তিকে এ খাতে বিনিয়োগ ছিল মাত্র ০.৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সে হিসাবে চলতি প্রান্তিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া ইতিবাচক। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখনো চ্যালেঞ্জিং।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এটি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতি তাদের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এর মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নাহিয়ান রহমান রচি আরও জানান, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে কাজ চলছে, যাতে আরও বেশি এবং উচ্চমানের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়। সম্প্রতি কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা আশাব্যঞ্জক। পাশাপাশি প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পে অগ্রগতির আশা
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বিনিয়োগের জন্য আরও প্রস্তুত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পটি এক দশকের বেশি সময় ধরে আটকে থাকলেও বর্তমানে এর উন্নয়নকাজ এগিয়ে চলছে। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ইনভেস্ট বাংলাদেশের ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ পর্যন্ত সম্পন্ন কাজ এবং যেসব ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন, তা তুলে ধরা হয়েছে। ভবিষ্যতেও কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জানানো হবে।
নাহিয়ান রহমান রচির মতে, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে শুধু আলোচনা ও ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রূপান্তর করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক সংকেত হলেও নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং বিনিয়োগ পাইপলাইনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।











