চীনের ৭৭তম জাতীয় দিবসে বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়


চীনের ৭৭তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের উদ্যোগে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাজধানীর হোটেল শেরাটনে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও চীনের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
![]() |
![]() |
এতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। বক্তব্যের শুরুতে তিনি চীনের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চীনের সরকার ও জনগণকে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।

ড. আবদুল মঈন খান বলেন, চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে চলতি বছরটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলকে চীনে যে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়েছে এবং সফরকালে অনুষ্ঠিত ফলপ্রসূ আলোচনা ও ভবিষ্যতমুখী প্রস্তাবগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, চীন ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের শিকড় আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠারও বহু আগে বিস্তৃত। প্রাচীনকাল থেকেই দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও যোগাযোগের আদান-প্রদান ছিল। চীনের প্রাচীন পরিব্রাজক ও পর্যটকদের এই অঞ্চলে আগমন এবং এ অঞ্চলের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের চীন সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের জনগণের মধ্যে ঐতিহাসিক যোগাযোগের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশ চীনকে অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে উল্লেখ করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প, প্রযুক্তি ও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। চীনের শীর্ষ পর্যায়ের সফর এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য রূপান্তরমূলক প্রকল্প ও নতুন সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, গত কয়েক দশকে তিনি নিজ চোখে চীনের ব্যাপক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটি যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা আধুনিক বিশ্বের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিপুল জনসংখ্যা ও তুলনামূলকভাবে সীমিত সম্পদের প্রেক্ষাপটে চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বৃহৎ পরিসরে ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে আগ্রহী। একই সঙ্গে শুধু সরকার-টু-সরকার সহযোগিতা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সাংবাদিক ও বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও বিনিময় দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও গভীর করবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সময় দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, সবুজ জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রদূতের প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
তিনি বলেন, আগামী দশকে বাংলাদেশ ও চীনের সহযোগিতা শুধু বাণিজ্য ও অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সংস্কৃতি, জনগণের যোগাযোগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে নিয়ে যেতে হবে। এমন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে, যা বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনগণের ক্ষমতায়ন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশেও ভূমিকা রাখবে।
চীনের জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশটির সরকার ও জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্ব ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে এবং দুই দেশের জনগণের জন্য আরও অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। বক্তব্যের শেষদিকে তিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য চীন পর্যন্ত যাওয়ার বিষয়ে প্রচলিত একটি ঐতিহাসিক বাণীও উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, চীনের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই সংবর্ধনায় উপস্থিত সবাইকে চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে আন্তরিক স্বাগত জানাচ্ছেন তিনি।
![]() |
![]() |
তিনি বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর ৭৭ বছরে দেশটি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে গেছে। চীনের জনগণ দেশের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে চলেছে।
চীনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীনের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট এবং শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের বিঘ্নের মধ্যেও চীনের অর্থনীতি স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইয়াও ওয়েন বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়নশীল দেশ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন কাঠামো গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন, সভ্যতা ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ এগিয়ে নিতে কাজ করছে। বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক উন্নয়নে চীন অবদান রাখছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, চলতি বছর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫১তম বার্ষিকী। একই সঙ্গে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভেরও ১০ বছর পূর্তি হচ্ছে। তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে দেশ পরিচালনায় সমর্থন করে এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থন অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও বড় ভূমিকা পালনের প্রতি সমর্থন রয়েছে চীনের।
রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক একটি ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বে’ উন্নীত হয়েছে। এই সফর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে এবং দুই দেশের জনগণের মৌলিক স্বার্থের সঙ্গে এই সম্পর্ক সামঞ্জস্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সত্ত্বেও দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশে তাঁর প্রায় তিন বছর নয় মাসের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ও এ দেশের মানুষের প্রতি তাঁর মধ্যে গভীর মমতা ও আবেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং দেশের জনগণের বিভিন্ন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত তিনি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের দৃঢ়তা, জাতীয় মর্যাদাবোধ ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের আশাবাদ, উদ্যম ও কর্মস্পৃহা তাঁর কাছে বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তরুণদের একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের মানুষের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিকতার কথাও স্মরণ করেন ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময়, আন্তরিক আলোচনা এবং একসঙ্গে পথচলার স্মৃতি তিনি নিজের হৃদয়ে ধারণ করবেন।
ভবিষ্যতে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও উজ্জ্বল হবে এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, চীন-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব চিরসবুজ থাকুক এবং দুই দেশের জনগণের সুখ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হোক।
অনুষ্ঠানে চীনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। পরে চীনের জাতীয় দিবসের ৭৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে কেক কাটা হয়।
সংবর্ধনায় উপস্থিত অতিথিরা বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
চীনের জাতীয় দিবসের এই আয়োজন দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের অঙ্গীকারকে আরও একবার সামনে তুলে ধরে।















