সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বারোপ করলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী


সিঙ্গাপুরের ৬১তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনার আয়োজন করে ঢাকাস্থ সিঙ্গাপুর হাইকমিশন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি সিঙ্গাপুরের সরকার ও জনগণকে জাতীয় দিবসের উষ্ণ শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সদিচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথমদিকের দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ফলে বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে সিঙ্গাপুরের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, সিঙ্গাপুর বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থনীতি, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুরের সাফল্য থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। একইসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ। সিঙ্গাপুরে বসবাসরত ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশির অবদানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন।
বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, শক্তিশালী জনসম্পর্ক বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করবে।
প্রধান অতিথি ঢাকায় সিঙ্গাপুরের বিদায়ী চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিচেল লি’র কূটনৈতিক দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য অভিনন্দন জানান এবং তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে বিদায়ী চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিচেল লি বলেন, সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবস ৯ আগস্ট হলেও বিদায় উপলক্ষে ঢাকায় এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি জানান, চলতি বছর সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতার ৬১ বছর পূর্তি এবং দেশটির ‘Singapore Pledge’ চালুর ৬০ বছর পূর্তি।
তিনি বলেন, ঐক্য, বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমতার যে মূল্যবোধ সিঙ্গাপুরের জাতীয় অঙ্গীকারে প্রতিফলিত হয়েছে, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও এসব মূল্যবোধ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রেও এসব মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস তুলে ধরে মিচেল লি বলেন, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীরা ঐতিহ্যগতভাবে সিঙ্গাপুরের নির্মাণ ও মেরিন সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
তিনি জানান, ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার, যা প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের ক্রমপুঞ্জীভূত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণও প্রায় ৩ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার বা প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
২০২২ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ করার কাঠামো তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) সম্পাদনের লক্ষ্যে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার বিষয়ে সিঙ্গাপুর আশাবাদী উল্লেখ করে মিচেল লি বলেন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস, বিমান পরিবহন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুরের সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা, ভিসা ও কনস্যুলার নেটওয়ার্কিং সেশন, রান্নার কর্মশালা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং প্রথমবারের মতো সিঙ্গাপুর-বাংলাদেশ আর্ট এক্সিবিশনের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর কো-অপারেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে সুশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভসে সিঙ্গাপুরের বই প্রদান করা হয়েছে।
মিচেল লি তার বিদায়ী বক্তব্যে ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে উষ্ণ বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার জন্য উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আগামীতে সিঙ্গাপুর অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে থাকলেও সবার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স-ডিজাইনেট ফিলিপ অং বলেন, ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির একটি হলো সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবস উদযাপনে অংশ নেওয়া। গত দুই বছরে মিচেল লি ও তার দলের উদ্যোগে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফিলিপ অং বলেন, তার সরকারের নির্দেশনা হলো দুই দেশের আর্থিক সম্পর্ককে আরও গভীর, বহুমুখী ও গতিশীল করা। বাংলাদেশে তার দায়িত্বকালে দুই দেশের মধ্যে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিদ্যমান জনগণভিত্তিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি জানান, ২০২৭ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছর পূর্তি হবে। একই বছর সিঙ্গাপুর আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবে। এ সময় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরের খাবার ও সংস্কৃতির পরিচিতি তুলে ধরতে সিঙ্গাপুর থেকে শেফ ড্যানিয়েল লিউকে আমন্ত্রণ জানানোর কথাও জানান ফিলিপ অং। তিনি বলেন, জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে সিঙ্গাপুরের রান্না বিষয়ক দ্বিতীয় পর্বের প্রশিক্ষণেও শেফ ড্যানিয়েল অংশ নেবেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।











