বাংলাদেশকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে আসিয়ান: আসিয়ান ঢাকা কমিটির চেয়ার ও মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার শুহাদা ওথমান


বাংলাদেশ ও আসিয়ানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করার আহ্বান জানিয়েছেন আসিয়ান ঢাকা কমিটির (ADC) চেয়ার ও বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও আসিয়ান পরস্পরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক কল্যাণ ও অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
সোমবার রাতে রাজধানীর রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলে আসিয়ানের ৫৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সমন্বয়ে গঠিত আসিয়ান ঢাকা কমিটি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান বলেন, ৫৯ বছরের অসাধারণ যাত্রা উদযাপনের পাশাপাশি এদিন আসিয়ানের ঐক্য, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সেই চিরস্থায়ী মূল্যবোধগুলোকেও উদযাপন করা হচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলকে একসঙ্গে আবদ্ধ করে রেখেছে। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ঐকমত্য ও সহযোগিতার নীতির ভিত্তিতে আসিয়ান আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক গভীর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আসিয়ানের যে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। বাংলাদেশ ও আসিয়ানের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের গন্তব্য হিসেবে আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্র মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া বাংলাদেশের কাছে আসিয়ান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর সম্পৃক্ততার গুরুত্বকে তুলে ধরে বলে মন্তব্য করেন মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার।

মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান বলেন, এ সফর বাংলাদেশ ও আসিয়ানের মধ্যে অংশীদারত্ব আরও গভীর করার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ শক্তিশালী করার বিষয়ে বাংলাদেশের দৃঢ় আগ্রহের প্রতিফলন।
আসিয়ান ঢাকা কমিটির চেয়ার বলেন, ৬৮ কোটিরও বেশি মানুষের আবাসস্থল আসিয়ান বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনৈতিক অঞ্চল। অন্যদিকে বাংলাদেশও এই অংশীদারত্বে বড় শক্তি নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বৃহৎ ও তরুণ জনগোষ্ঠী, তাদের ক্রমবর্ধমান দক্ষতা, আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা আসিয়ান-বাংলাদেশ সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও আসিয়ানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক আসিয়ান ঢাকা কমিটির বিভিন্ন কার্যক্রম, সম্পৃক্ততা ও জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েও প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশে কর্মরত আসিয়ান মিশনগুলো বছরজুড়ে বাংলাদেশি জনগণের কাছে আসিয়ানকে আরও পরিচিত করে তুলতে এবং দুই অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যমান সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশ ও আসিয়ানের বিদ্যমান উষ্ণ বন্ধুত্বের প্রতিফলন এবং ভবিষ্যতে আরও গভীর সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় আসিয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান বলেন, বাংলাদেশ ও আসিয়ান একে অপরের শক্তিকে পরিপূরক করে পারস্পরিকভাবে লাভজনক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। আগামী দিনগুলোতে বিদ্যমান ইতিবাচক গতি কাজে লাগিয়ে দুই পক্ষের অংশীদারত্ব আরও গভীর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে ধন্যবাদ জানিয়ে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও স্থানীয় পণ্যের মাধ্যমে ‘ফুড ডিপ্লোম্যাসি’র একটি অনন্য উদাহরণ তুলে ধরার প্রশংসা করেন। তিনি বিশেষভাবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট দিয়ে তৈরি কাচ্চি বিরিয়ানি পরিবেশনের কথা উল্লেখ করেন।
মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান বলেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ খাদ্যঐতিহ্য ও স্থানীয় উৎপাদনকে তুলে ধরার এ উদ্যোগ কেবল একটি খাবার পরিবেশন নয়; বরং এটি মানুষ ও সংস্কৃতিকে কাছাকাছি আনার একটি অনন্য মাধ্যম। তাঁর ভাষায়, কূটনীতি শুধু সরকার থেকে সরকারের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনগণ ও সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অনুষ্ঠানে অতিথিদের উদ্দেশে রসিকতার সঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট অবশ্যই চেষ্টা করে দেখা উচিত—কারণ প্রতিদিন কূটনীতির সঙ্গে এমন ‘সুস্বাদু আমন্ত্রণ’ আসে না।

এদিকে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সঙ্গে আসিয়ানের সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত নিনা পাদিলা কেইংলেট। তিনি বলেন, প্রায় ছয় দশকের পথচলায় ঐকমত্য, ধৈর্য ও পারস্পরিক আস্থা আসিয়ানকে এগিয়ে নিয়েছে। প্রায় ৭০ কোটি মানুষের এই অঞ্চলের সম্মিলিত অর্থনীতি প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
২০২৬ সালে ফিলিপাইনের আসিয়ান চেয়ারশিপের প্রতিপাদ্য “Navigating Our Future Together” উল্লেখ করে নিনা পাদিলা কেইংলেট বলেন, আসিয়ানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সংহতি ও অভিন্ন সংকল্প। শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, স্থিতিস্থাপক ও জনগণকেন্দ্রিক একটি আঞ্চলিক সম্প্রদায় গড়ে তুলতে সদস্যরাষ্ট্রগুলো একসঙ্গে কাজ করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ আসিয়ানকে সহযোগিতা করে আসছে এবং আসিয়ানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে Sectoral Dialogue Partner হওয়ার জন্য আবেদন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP)-এ যোগ দেওয়ার আগ্রহও দেখিয়েছে।
ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ ও আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অ্যাকুয়াকালচার, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন, কূটনীতিকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রশংসা করেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আসিয়ান ঢাকা কমিটির বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এসব উদ্যোগের প্রাণবন্ত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গত বছর বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধবিষয়ক আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামের (ARF) বৈঠক এবং আসিয়ান কূটনীতিকদের জন্য কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজনের পাশাপাশি সম্প্রতি মৎস্য ও জলজ সম্পদ খাতে দুর্যোগ ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও অভিযোজন কৌশল নিয়ে একটি কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আসিয়ানের ৫৯ বছরের অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও আসিয়ানের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মৎস্য ও জলজ সম্পদ, আইসিটি এবং জনসম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
মোহাম্মদ শুহাদা ওথমান তাঁর বক্তব্যের শেষে আসিয়ান ঢাকা কমিটির কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনায় কমিটির ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্যদের কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ করে Southeast Asia, Myanmar and Regional Organizations Wings, কূটনৈতিক কোর, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও থিংকট্যাংকগুলোর সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আসিয়ানের ৫৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও জোরদার করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাকে সামনে আনা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশকে আসিয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে মোহাম্মদ শুহাদা ওথমানের বক্তব্য দুই অঞ্চলের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট করে।











