ডেস্ক রিপোর্টঃ
ঢাকা মহানগরী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এবং যানজট নিরসনে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারভুক্ত প্রস্তাবিত প্রকল্প ‘ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্প’ নির্মাণের লক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার (৫ মে, ২০২৬) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক উচ্চপর্যায়ের স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি উক্ত কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মোঃ রাজিব আহসান এমপি। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন সেতু বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক জনাব মোহাম্মদ আবদুর রউফ।

কর্মশালায় শুরুতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী ও ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কাজী মো: ফেরদাউস স্বাগত বক্তব্যে প্রকল্পের কারিগরি দিকসমূহ তুলে ধরেন। যানজট নিরসনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে প্রস্তাবিত ৩৮.৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ (N5 থেকে N1 পর্যন্ত) এই এক্সপ্রেসওয়েটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর হতে শুরু হয়ে আটিবাজার, আবদুল্লাহপুর, জলপরীবাজার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ৫টি প্রধান ইন্টারচেঞ্জ: N5, আটিবাজার সড়ক, N8, R111 এবং N10। ২টি প্রধান নদী- বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা অতিক্রম করবে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন সংযুক্ত করবে। ২টি জেলায় ৫টি উপজেলায় বিস্তৃত হবে। পিপিপি ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান বাজারদরে প্রকল্পটির ট্রানজেকশন এডভাইজার হিসেবে নির্মাণ ব্যয় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য হালনাগাদের লক্ষ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি)-কে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে নিয়োগ প্রদান করা হয়। গত ০৮ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। আজকের কর্মশালায় মূলত আইআইএফসি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত হালনাগাদকৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা রিপোর্টের ওপর সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ ও পর্যালোচনা করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি বলেন, ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকাকে বাইপাস করে হেমায়েতপুর থেকে নারায়ণগঞ্জকে কানেক্ট করার মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সাথে পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে ঢাকার যানবাহন চলাচলের গতি বাড়বে এবং প্রায় অর্ধেক যানজট কমে যাবে। এরইমধ্যে আপডেটেড ফিজিবিলিটি স্টাডিস সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে আমাদের দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করবে। কিন্তু এর দীর্ঘসূত্রতা ও অর্থ অপচয়ের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে আমাদের অনেক টাকার অপচয় হয়েছে। সময় মতো ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। সময় মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করলে তা অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এসব পরিবর্তনের জন্য কমিটমেন্ট দরকার। পরিকল্পনা দরকার বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ৫৩ বছরের অবকাঠামো নির্মাণের যে রাষ্ট্রীয় প্র্যাকটিস, সেটি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। সেলফ কারেকশন এবং লক্ষ্য ঠিক না করে আমরা আগের সরকারের মতো ঢালাওভাবে মেগা প্রজেক্ট নিতে চাই না। আমরা এমনভাবে অর্থ ব্যয় করতে চাই যাতে অর্থের অপচয় হবে না ও জনগণ সুফল পাবে। তিনি নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমান সরকার অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নিরুৎসাহিত করে, তবে যেটার প্রয়োজন আছে সেটি মাঝারি, ছোট, বড় যা হোক তা করা হবে। এই প্রকল্প অনেক প্রয়োজনীয় হলেও এর বাস্তবায়ন ত্রুটিযুক্ত, যেভাবে ত্রুটিমুক্ত ভাবে করা যায় সে লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মোঃ রাজিব আহসান এমপি বলেন, যানজটে জ্বালানি ও উৎপাদনশীলতা ব্যহত হচ্ছে। এখন একটি আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবস্থা সময়ের দাবি। সেজন্য সরকার এ ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে সময় বাঁচবে, যানবাহনের গতি বাড়বে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহণ ও আন্তঃনগর পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর্থিক বিশ্লেষণ বলছে, বাস্তবসম্মত টোল কাঠামো নির্মাণ করা গেলে প্রকল্পটি বাস্তবসম্মতভাবে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। আমরা প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপে প্রকল্প করতে চাই যা মাইলফলক হবে।

তিনি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের উল্লেখ্য বলেন, যেভাবে যতোটুকু সময়ের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করা যায় সে সময়েই করবেন। বড় প্রকল্প মানেই বড় দুর্নীতি এই ধারণা থেকে আমরা বের হতে চাই। আমরা আরও এ ধরণের প্রকল্প নিতে চাই, তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যেন বিতর্কহীন হয়। আগের প্রকল্পগুলো জন্ম থেকেই বিতর্ক তৈরি করেছে। আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রম মানুষের সামনে আসে না সামনে আসে বিতর্ক। সামনের যেকোনো প্রকল্পতে মানুষের এসব পার্স্পেক্টিভ বদলে দিতে হবে। সবাইকে নিয়ে বিতর্কহীনভাবে এ সেক্টরটিকে এগিয়ে নিতে চাই । প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে থাকে দীর্ঘসূত্রতা। এ দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ জমি অধিগ্রহণ। জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি।
সেতু বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক জনাব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সদয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই এক্সপ্রেসওয়েটি কেবল একটি সড়ক নয়, এটি হবে একটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন। সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত হয়ে নির্ধারিত সময়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং সময় ও জ্বালানি উভয়ই সাশ্রয় হবে। সবার উপরে দেশ আমরা গড়বো বাংলাদেশ।
এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি মহাসড়ক N5 (ঢাকা-আরিচা), মহাসড়ক N8 (ঢাকা-মাওয়া) এবং মহাসড়ক N1 (ঢাকা- চট্টগ্রাম) কে ইন্টার সেকশনের মাধ্যমে সংযুক্ত করে নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহের যানবাহনসমূহ হানিফ ফ্লাই-ওভার মারফত ঢাকা শহরে প্রবেশ না করে নির্মিতব্য এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে উল্লিখিত জেলাসমূহে সরাসরি গমন করতে পারবে। এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম-সিলেটসহ পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তথা খুলনা ও বরিশালের যানবহনসমূহ ঢাকা শহরে প্রবেশ না করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ২০টি জেলায় সরাসরি চলাচল করতে পারবে। এটি এশিয়ান হাইওয়ের সাথেও সংযুক্ত হবে। এর ফলে ঢাকা ও এর পাশ্ববর্তী এলাকার যানজট অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
কন্টিজেন্সি এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় ব্যতিরেকে প্রকল্পের স্থাপনা নির্মাণ ব্যয় ২২,০০০ কোটি টাকা এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনঃবাসন ব্যায় ১৪,০০০ কোটিসহ মোট প্রকল্প ব্যায় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬,০০০ কোটি টাকা (২.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ২০২৫ সালে পরিচালিত ট্রাফিক জরিপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালে এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে দৈনিক যানবাহন সংখ্যা ২১,০০০-২৫,০০০+ এর মধ্যে হবে এবং ২০৫০ সালে তা ৫০,০০০+ অতিক্রম করতে পারে। এক্সপ্রেসওয়েটি বাস্তবায়ন হলে যানবাহনের গড় গতি ২০/৩০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা হবে। ফলে যাত্রা সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
প্রকল্পটির অর্থনৈতিক মূল্যায়ন Social Cost-Benefit Analysis (SCBA) পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে প্রকল্পসহ ও প্রকল্প ব্যতীত অবস্থার তুলনা করা হয়েছে। প্রকল্পের EIRR: ১৬.৪২%। প্রকল্পের আর্থিক বিশ্লেষণ Base Case Model এর মাধ্যমে করা হয়েছে (ট্রাফিক, টোল, ব্যয় ও অর্থায়ন কাঠামোর ভিত্তিতে)। বেস টোল: BDT ৯.২০/km এবং ৩০% VGF ধরে প্রজেক্ট FIRR ৭.৬৬%।উপযুক্ত VGF সহায়তা ও বাস্তবসম্মত টোল কাঠামোর সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটিকে আর্থিকভাবে টেকসই ও বিনিয়োগযোগ্য করা সম্ভব। তাই যেসব পরামর্শ আমাদের এই সভায় বিভিন্ন অংশীজন দিয়েছেন সেগুলো সমন্বিত করে বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয় করে এ কাজটি এগিয়ে নিতে হবে।
কর্মশালায় আইআইএফসি-এর প্রতিনিধিগণ তাদের বিস্তারিত পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। উন্মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষজ্ঞ স্টেকহোল্ডারগণ তাদের মূল্যবান গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করেন। কর্মশালায়, প্যানেল অফ এক্সপার্ট এর সম্মানিত সদস্যগণ, সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ উপস্থিত ছিলেন।











