বাংলাদেশ–সিঙ্গাপুরের মধ্যে দক্ষ জনশক্তি, প্রশিক্ষণ ও যুব উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা


বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, এমপি, সিঙ্গাপুরের জনশক্তি এবং সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও যুববিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দিনেশ বাসু দাশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট ২০২৬) সকাল সাড়ে ১১টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার ন্যায়সংগততা, সুশাসন এবং দেশের জনগণের জন্য আরও ভালো সুযোগ সৃষ্টি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সিঙ্গাপুরে বসবাসরত বৃহৎ বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
![]() |
![]() |
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) খাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সিঙ্গাপুর অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে উল্লেখ করে তিনি এ খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে সিঙ্গাপুরের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রস্তাব দেন তিনি।
দিনেশ বাসু দাশ বলেন, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। এ বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও যৌথভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অবদানেরও প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা সাধারণত শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল।
জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রবাসীদের ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তাদের তৃতীয় একটি ভাষা শেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং পরিচর্যা ও নার্সিং খাতে তাদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরে বয়স্কদের পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশি নার্সদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে সিঙ্গাপুরের প্রতি প্রস্তাব দেন তিনি।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সিঙ্গাপুরের সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। দিনেশ বাসু দাশ শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় ও বিভিন্ন ফি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ ব্যয় কমানো এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম আরও নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সাশ্রয়ী করতে মধ্যস্বত্বভোগী ও ট্রাভেল এজেন্সির ভূমিকা পর্যালোচনাসহ যৌথভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের উপায় খুঁজে বের করার প্রস্তাব দেন তিনি।
দিনেশ বাসু দাশ সিঙ্গাপুরে অভিবাসী শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তিনি জানান, অভিবাসী শ্রমিকদের ডরমিটরির মানোন্নয়ন এবং আবাসন ব্যবস্থায় আরও কঠোর মানদণ্ড বাস্তবায়নে সিঙ্গাপুর সরকার বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে অভিবাসী শ্রমিকের চাহিদা এবং উপযুক্ত আবাসন সুবিধার প্রাপ্যতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব উদ্যোগের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে তিনটি কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর সম্প্রতি চাকরি হারানো প্রায় ২০০ বাংলাদেশি শ্রমিকের পুনঃকর্মসংস্থান ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় সিঙ্গাপুর সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
দিনেশ বাসু দাশ অভিবাসী শ্রমিকদের বকেয়া বেতন সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হলে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানান। এতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি শ্রমিকদের সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে পারবে বলে তিনি জানান। সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন কমিউনিটি কার্যক্রম ও উৎসবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ইতিবাচক অংশগ্রহণেরও প্রশংসা করেন তিনি। তাদের অংশগ্রহণ সিঙ্গাপুরে জাতিগত ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বলেও উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দিনেশ বাসু দাশকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করা এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে সহযোগিতার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর একটি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
দিনেশ বাসু দাশ এ প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বলেন, সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও যুববিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অতিরিক্ত দায়িত্বের আলোকে এসব ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার সুযোগ খুঁজে দেখতে তিনি আগ্রহী।
বৈঠকে বাংলাদেশকে আসিয়ানের (ASEAN) ডায়ালগ পার্টনার করার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সিঙ্গাপুরের সমর্থন কামনা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সফট ডিপ্লোমেসি, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতিকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সরকার সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বাজেট বরাদ্দ করেছে বলেও তিনি জানান।
এ ছাড়া নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী ধারণার আদান-প্রদান এবং তরুণদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা অথবা সিঙ্গাপুরে একটি যুবকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যৌথ উদ্যোগ, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আরও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিসসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সহজ ও হয়রানিমুক্ত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
এ সময় দিনেশ বাসু দাশ বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি সম্প্রতি ঢাকায় কার্যক্রম শুরু করা সিঙ্গাপুরভিত্তিক রেস্টুরেন্ট চেইন ‘ফিশ অ্যান্ড কো’-এর উদাহরণ তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং উভয় দেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে বাংলাদেশ আগ্রহী।
উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উভয় পক্ষ দক্ষ জনশক্তি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ, যুব উন্নয়ন, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশ করে।













