নির্বাহী সম্পাদক, প্রকৌঃ মোহাম্মদ সজীবুল-আল রাজীবঃ
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের পরিণতি কী হতে পারে তা দেশের মানুষ ৫ আগস্ট দেখেছে। মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে কমিয়ে আনতে হবে। মতপার্থক্য যেন মতবিরোধের পর্যায়ে না যায়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যে কোন মূল্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। আমাদের সমস্যা ছিল, সমস্যা আছে। কিন্তু আমরা ৫ আগস্টের আগে ফিরে যেতে চাই না। তাই মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।’
আজ শনিবার (১০ জানুয়ারি, ২০২৬) রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে দেশের জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমগুলোর সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বিএনপির চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন।

দেশে ফিরে বিভিন্ন স্থানে সফর করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তার কাছে মনে হয়েছে নতুন প্রজন্ম একটি দিকনির্দেশনা ও আশার খোঁজ করছে। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, সব প্রজন্মই একটি গাইডেন্স প্রত্যাশা করছে। যারা রাজনীতি করেন, তাদের প্রতি মানুষের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। সব প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব না হলেও, রাজনীতিবিদরা যদি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করেন, তাহলে জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।’
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, কাজের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশ থেকে যারা দেশের বাইরে যাচ্ছেন, তাদের যদি আমরা সেই দেশের ভাষাটা শিখিয়ে দিতে পারি, সেখানে যে কাজগুলোতে তারা যাচ্ছেন, তাদের যদি সেসব কাজে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠাতে পারি, তাহলে সেখানে গিয়ে আরও ভালো করতে সক্ষম হবে।

নারীদের নিরাপত্তা বিষয়ে এক নারী সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘শুধু নারীর নয়- নারী ও পুরুষ সবারই নিরাপত্তা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যা অস্বাভাবিক। কোনো বছর কম, কোনো বছর বেশি হলেও এমন ঘটনা কেন ঘটছে- তা নিয়ে রাজনীতিবিদদের গভীরভাবে ভাবা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশে ফিরে যে ‘প্লানের’ কথা আমি বলেছিলাম, তার একটি হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। আমাদের দেশে গড়ে ৪ কোটি পরিবার রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আমরা একটা পরিবারকে সারাজীবন সহায়তা করে যাব, এমনটি নয়। ৫ থেকে ৭ বছর আমরা ওই পরিবারটিকে সাপোর্ট দিয়ে যাব, সেটা টাকার হিসাবে কিংবা অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে। আমরা দেখেছি, একজন নারীকে যদি এই সাপোর্টটা দেওয়া যায়, তাহলে তিনি সেটি তার পরিবারের জন্য সঠিকভাবে খরচ করেন।
আমরা রিসার্চ করে দেখেছি, ৫-৭ বছর যদি এই সাপোর্টটা দেওয়া যায়, তাহলে যে অর্থটা তার (নারী) হাতে জমা হয়, সেটা তিনি মূলত তিনটি কাজে খরচ করেন: প্রথমত, তার পরিবারের স্বাস্থ্যের পেছনে, দ্বিতীয়ত, ছেলেমেয়েদের শিক্ষার পেছনে এবং তৃতীয়ত, জমা করা অর্থ তিনি ছোট ছোট খাতে বিনিয়োগ করেন। এভাবে বিনিয়োগের ফলে ধীরে ধীরে গ্রামের, সমাজের অর্থনীতি মজবুত হবে। এভাবে একটি উপজেলা, জেলার অর্থনীতি মজবুত হবে বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, আমি একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী। আগামী ২২ তারিখ থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাকালে আমরা সকলে জনগণের কাছে যাবো। জনগণের ভোটে আগামীতে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে সকলের সমালোচনা সঙ্গে নিয়েই আমরা জনগণের সকল সমস্যা সমাধান করবো।
কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে না পারলে সব অর্জন ধ্বংস হয়ে যাবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি নারী, কৃষক, প্রবাসী ও তরুণসহ নাগরিকদের জীবন মান উন্নয়নে নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
এর আগে বেলা ১১ ২০ মিনিটে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কোরআন তেলওায়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। তারেক রহমান উপস্থিত সাংবাদিকের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন।

পরে স্বাগত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজ এক কঠিন সময়ে আমাদের নেতা তারেক রহমান বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন। তিনি দূর থেকে এই দেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছেন, তাতে গোটা জাতি আজকে অনেক বেশি আশান্বিত হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা- বহু বছর পরে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশকে একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবে পারব।’

আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক রেজাউল করিম রনি, তিনি বলেন, আমরা অনেকদিন যাবত একটি ফ্যাসিবাদি সিস্টেমের মধ্যে ছিলাম। মুক্ত সাংবাদিকতা এবং ফ্যাসিবাদ দুটি এক্সসাথে থাকতে পারেনা। তাই আমাদেরকে গনমাধ্যম হিসেবেই কাজ করা উচিৎ।

আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, স্বৈরাচার সরকারের আমলে তাদের সত্য তুলে ধরার কারণে বহু সংবাদকর্মীদেরকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়েছে, জেলে নেয়া হয়েছে, অত্যাচার করা হয়েছে, কিন্তু তখনকার সময়ে মিডিয়া এ নিয়ে তেমন কিছু করতে পারেনি, আমাদেরকে তাই সত্যের পথে অবিচল থাকতে হবে।

শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদুর রহমান বলেন, নির্বাচন হলেই গনমাধ্যম মুক্ত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে তা সঠিক নয়, তবে আমরা আশা রাখতে পারি এই ভেবে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে যথেষ্ট মুক্ত গণমাধ্যমে বিশ্বাস করেছে। সে কারণে আমি আশা রাখতে চাই সামনের সময় এটা খুব ভালো জায়গায় পৌঁছাবে।

নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, জনাব তারেক রহমানকে আমার পক্ষ থেকে একটাই শুভেচ্ছা থাকবে, তা হল কি করলে বাংলাদেশ সমাজ এবং রাস্ট্রের গনত্রান্তিক বিকাশের সহযোগিতা হতে পারে সেগুলি যেন করতে পারেন সেই শুভেচ্ছা আমি উনাকে জানাচ্ছি।

কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, আমরা সাংবাদিকবান্ধব প্রশাসন চাই। কিন্তু আমরা সেটা দীর্ঘকাল পাইনি। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় আমরা অনেক মিডিয়া ট্রায়াল, তেলবাজির সাংবাদিকতা দেখেছি। আমরা এটি বন্ধ হোক চাই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, জনাব তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন, কিছু স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন, কিছু পরিকল্পনা আছে তার উনি বলেছেন। আমি শুধু বলব তার সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক।

মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আমি এক তারেক রহমানকে চিনতাম, ২৩ বছর আগে আমি প্রথম ইলেকট্রনিক্স সাংবাদিকতার প্রথম সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম জনাব তারেক রহমানের। সেদিন চ্যানেল আই-তে সেই সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিলো। আজ তাকে আবার দেখছি তিনি এখন আমুল পরিবর্তন হয়ে গেছেন। আমরা স্বাধীনভাবে লিখতে চাই আমরা স্বাধীনভাবে বলতে চাই।

যুগান্তর সম্পাদক আব্দুল হাই সিকদার বলেন, আপনি যেভাবে সাংবাদিকদের কথা শুনতে চাচ্ছেন, এবং মতবিনিময় করতে চান এটি অনেক ভালো উদ্যোগ, আশা করি সামনেও এটি চালু থাকবে।

সাংবাদিক মমতাজ বিলকিস বলেন, দীর্ঘদিন পর আপনি দেশে এসে দেখেছেন, আপনাকে একটু দেখতে, আপনার কথা শুনতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল ছিল। তাদের চাওয়া একটাই, আপনি বলেছেন সবার আগে বাংলাদেশ। এটার বাস্তবায়ন তারা দেখতে চায়।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, আমরা গণতন্ত্র চাই, স্বাধীন সাংবাদিকতা চাই এবং সুশাসন চাই।

বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, আমি সম্প্রতি দেখেছি একটি পরিসঙ্খ্যানে এসেছে দেশের প্রায় ৭০% মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে আগ্রহী, এই কথার মধ্যে সত্যতা আছে, কিন্তু এই আগ্রহটাকে ভোটে পরিনত করতে হবে।
এছাড়াও আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন এবং বিএনপি বিটের বেশ কয়েকজন সাংবাদিক।
অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদসহ দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও জাতীয় সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদ সংস্থা ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।











