Featuredকনস্যুলার কোরকে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের দূত হওয়ার আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের
ডিপ্লোম্যাটিক ডেস্কঃবাংলাদেশে কর্মরত কনস্যুলার কোর (Consular Corps in Bangladesh-CCB)-এর সদস্যদের বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, কনস্যুলার কোরের সদস্যরা শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন; বরং তারা বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সোমবার (২৭ জুলাই, ২০২৬) রাতে বাংলাদেশে কর্মরত কনস্যুলার কোরের (সিসিবি) নির্বাহী কমিটির আয়োজনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সম্মানে অনুষ্ঠিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, মিশনপ্রধান, অনারারি কনসাল, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কনস্যুলার কোরের সদস্যদের প্রতি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা তুলে ধরে বলেন, তারা যেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সুযোগ বিশ্বে তুলে ধরেন, প্রযুক্তি, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন, বিশেষ করে আফ্রিকাসহ উদীয়মান অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণে সহায়তা করেন, জনগণের সঙ্গে জনগণের (People-to-People) সম্পর্ক আরও জোরদার করেন এবং বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবসময় কনস্যুলার কোরের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করবে, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সমন্বয় দেবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি আন্তরিক উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে।শামা ওবায়েদ বলেন, অনারারি কনসালদের ভূমিকা কখনোই কেবল আনুষ্ঠানিক নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও তাদের অবদান বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার "Bangladesh First" নীতিকে সামনে রেখে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ অধিকতর বিদেশি বিনিয়োগ, নতুন রপ্তানি বাজার, উন্নত প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অংশীদারিত্ব, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীলতায় বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা চায়। এসব লক্ষ্য অর্জনে অনারারি কনসালরা সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র চিহ্নিত করে উপযুক্ত অংশীদারদের সংযুক্ত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।তিনি বলেন, বাংলাদেশ কেবল একটি বৃহৎ ভোক্তা বাজার নয়; এখানে রয়েছে তরুণ ও পরিশ্রমী কর্মশক্তি, উদ্যমী উদ্যোক্তা, সম্প্রসারিত উৎপাদনভিত্তি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে কৌশলগত অবস্থান। ফলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ, উৎপাদন, লজিস্টিকস ও আঞ্চলিক সংযোগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা যেমন স্বাগত, তেমনি বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও উদ্ভাবকদেরও বৈশ্বিক বাজারে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ ধরনের অংশীদারিত্ব অবশ্যই পারস্পরিক লাভজনক হওয়া উচিত।অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে কনস্যুলার কোর ইন বাংলাদেশ (সিসিবি)-এর সভাপতি ও মঙ্গোলিয়ার অনারারি কনসাল জেনারেল নাসরীন ফাতেমা আওয়াল বলেন, কনস্যুলার কোরের সভাপতি হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারা তাঁর জন্য গভীর গর্ব ও সম্মানের। তিনি বলেন, ভিন্ন ভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করলেও সবার লক্ষ্য এক—বাংলাদেশ ও বিশ্বের মধ্যে স্থায়ী সেতুবন্ধন গড়ে তোলা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিসিবি একটি সাধারণ ফোরাম থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছে এবং আধুনিক কূটনীতির জটিল বাস্তবতায় সদস্যদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছে।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের প্রশংসা করে নাসরীন ফাতেমা আওয়াল বলেন, কিশোরী বয়স থেকেই তিনি শামা ওবায়েদকে চেনেন এবং তখনই তাঁর নেতৃত্বগুণ ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পরিচয় পেয়েছিলেন। আজ তাঁকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে দেখে তিনি গর্বিত এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও বিশ্বের জন্য তাঁর আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। তাই কনস্যুলার কোরের সদস্যদের দায়িত্ব হবে বাণিজ্য অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তি ও শিল্পখাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করা। একই সঙ্গে তিনি বলেন, টেকসই কূটনীতির ভিত্তি হলো সাংস্কৃতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। পারস্পরিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া যত বাড়বে, ততই আস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী হবে।নাসরীন ফাতেমা আওয়াল জানান, কনস্যুলার কোরের সংবিধান সংশোধনের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ক্যারিয়ার কূটনীতিক ও সাবেক অনারারি কনসালদের সংগঠনের সদস্যপদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা সংগঠনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তিনি আরও জানান, অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক আয়োজন রাখার পরিকল্পনা থাকলেও দেশের বন্যাদুর্গত মানুষের প্রতি সংহতি ও সম্মান জানিয়ে তা স্থগিত করা হয়েছে। বন্যাকবলিত পরিবারগুলোর জন্য দোয়া ও শুভকামনা জানিয়ে তিনি তাদের দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিসিবির সহ-সভাপতি শাহাব সাত্তার (সাইপ্রাস) ও শাখাওয়াত হোসেন (পর্তুগাল), মহাসচিব কাজী শাহ মুজাক্কের আহমাদুল হক ইশমাম (ক্রোয়েশিয়া) এবং কোষাধ্যক্ষ মাসুদ জামিল খান (আয়ারল্যান্ড)। আয়োজকরা জানান, এই সংবর্ধনা কূটনৈতিক সম্প্রদায়, সরকার, অনারারি কনসাল, ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে অর্থবহ সংলাপ ও নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কনস্যুলার কোরের ভূমিকা আরও সুদৃঢ় করেছে।