February 15, 2026

শিরোনাম
  • Home
  • অন্যান্য খবর
  • ১৩তম জাতীয় নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ভোটারদের অংশগ্রহণে অগ্রগতি: বি-স্ক্যানের পর্যবেক্ষণ

১৩তম জাতীয় নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ভোটারদের অংশগ্রহণে অগ্রগতি: বি-স্ক্যানের পর্যবেক্ষণ

Image

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ও প্রবেশগম্যতা নিয়ে একটি প্রাথমিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন বি-স্ক্যান। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এখনও কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত নানা বাধা রয়ে গেছে।

বি-স্ক্যান জানায়, ফরিদপুর, দিনাজপুর, মেহেরপুর জেলা এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১১০টি ভোটকেন্দ্রে ১০০ জন প্রশিক্ষিত প্রতিবন্ধী পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হয়। তারা ভোটগ্রহণের সূচনা, ভোটদান প্রক্রিয়া ও গণনা কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সংস্থাটির দাবি, তাদের পর্যবেক্ষকরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে আচরণবিধি মেনে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিশেষভাবে প্রতিবন্ধী ভোটারদের অংশগ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

নির্বাচন-পূর্ব সময়ে সংস্থাটি একটি নীতিগত ঘাটতি বিশ্লেষণ (Policy Gap Analysis) সম্পন্ন করে। এতে দেখা যায়, যদিও বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ United Nations-এর অধীন কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করেছে, তবুও নির্বাচনী আইন ও প্রক্রিয়ায় সেই অঙ্গীকারের পূর্ণ প্রতিফলন নেই। বিশ্লেষণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পূর্ণ অধিকারধারী হিসেবে স্পষ্ট স্বীকৃতির অভাব, বাধ্যতামূলক প্রবেশগম্যতা মানদণ্ডের অনুপস্থিতি, সহায়ক ভোটদান প্রক্রিয়ায় অস্পষ্টতা এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হয়।

প্রবেশগম্যতা মূল্যায়নে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র—বিশেষ করে স্কুল ভবনগুলো—এখনও পর্যাপ্তভাবে প্রবেশগম্য নয়। ৪৪ শতাংশ কেন্দ্রে প্রবেশপথে সিঁড়ি ছিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিকল্প র‍্যাম্পের ব্যবস্থা ছিল না। যেখানে র‍্যাম্প ছিল, সেগুলোর প্রায় কোনোটিই সুপারিশকৃত ঢাল অনুপাত মেনে নির্মিত হয়নি। এছাড়া নিচতলায় ভোটকক্ষের স্বল্পতা, অপর্যাপ্ত সাইনেজ ও পরিবহন সীমাবদ্ধতা প্রতিবন্ধী ভোটারদের ওপর অসম প্রভাব ফেলেছে।

নির্বাচন দিবসে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ৭৮ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে সক্ষম হয়েছেন। ৭৩ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটকক্ষের ভেতরের স্থান হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল। তবে কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে স্নায়ুবিক বিকাশজনিত প্রতিবন্ধী ভোটারদের স্বাধীন মতপ্রকাশে সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে এবং নির্বাচন কর্মকর্তারা তাদের পক্ষে ব্যালটে চিহ্ন দিয়েছেন—যা গোপনীয়তা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন উত্থাপন করে।

ভোটকেন্দ্রে আগমন ও প্রবেশের ক্ষেত্রে ৭৪ শতাংশ কেন্দ্রে মূল প্রবেশদ্বার পর্যন্ত বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করা হলেও, ৬০ শতাংশ কেন্দ্রে প্রবেশদ্বার হুইলচেয়ারের উপযোগী ছিল। প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে চলাচলের পথ পরিষ্কার ছিল, যা শারীরিক প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য সহায়ক হয়েছে।

ভোটকক্ষ ও অগ্রাধিকার সুবিধার ক্ষেত্রে ৭৪ শতাংশ কেন্দ্রে প্রতিবন্ধী ভোটারদের লাইনে অপেক্ষা করতে হয়নি। তবে ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে তাদের সাধারণ লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। ৫১ শতাংশ কেন্দ্রে অগ্রাধিকার সুবিধা পাওয়া গেছে। যদিও দুই-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রে করিডোর ও দরজার প্রস্থ মানসম্মত ছিল, অর্ধেক ভোটকক্ষ নিচতলায় না থাকায় সহজ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত হয়নি।

তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেখা গেছে, সব কেন্দ্রেই কর্মকর্তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণবিধি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলে জানিয়েছেন। তবে ৪১ শতাংশ তথ্য হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বা কম উচ্চতার ব্যক্তিদের নাগালের বাইরে ছিল। ৩৬ শতাংশ তথ্য দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বা স্নায়ুবিক বিকাশজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পাঠযোগ্য ছিল না এবং ৪৬ শতাংশ ক্ষেত্রে আংশিক পাঠযোগ্য ছিল।

সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে নির্বাচন কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ইতিবাচক ছিল বলে জানায় বি-স্ক্যান। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভোটারদের বড় অংশ সহায়তা পেয়েছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে। তবে স্নায়ুবিক বিকাশজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ ভোটদানে সফল হতে পারেননি, যা উন্নত সহায়ক ব্যবস্থা ও মানসম্মত দিকনির্দেশনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও তারা পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। অনলাইন জরিপ ও ফোকাস গ্রুপ আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ভোটারদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি জোরদারে সুপারিশ তুলে ধরা হবে।

বি-স্ক্যানের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন কেবল সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি আইনগত সামঞ্জস্য, বাধ্যতামূলক প্রবেশগম্যতা মানদণ্ড এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। এসব নিশ্চয়তা ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার কাগজে-কলমে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তা সীমিতই থেকে যায়।

Scroll to Top