অনলাইন ডেস্কঃ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের শাপলা প্রতীকের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত নির্বাচনি ভাষণে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বৈষম্যনির্ভর ও অন্যায়ভিত্তিক আখ্যা দিয়ে তা ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক ‘ইনসাফের রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সম্প্রচারিত ভাষণে নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তিই ছিল বৈষম্য। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, বিচারব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের ভাগ্য বদলে নিলেও সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বঞ্চিতই থেকে গেছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ছিল এই বৈষম্যমূলক বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে একটি গণবিদ্রোহ। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও সেই বেইনসাফ কাঠামো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এনসিপির লড়াই হবে এই নিপীড়নের ব্যবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে চূড়ান্তভাবে উৎখাত করা।
গুম-খুন ও নির্যাতনের বিচার হবে
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার মাধ্যমে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে দলীয় স্বার্থে কাজে লাগানো হয়েছিল।
তিনি বলেন, এনসিপি সরকার গঠন করতে পারলে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংঘটিত সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করা হবে এবং কোনো অপরাধীকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না।
ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্পের লুটের টাকা ফেরত আনার ঘোষণা
নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় এনে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
তিনি জানান, লুটপাটকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে একটি পাবলিক ট্রাস্টের মাধ্যমে তা জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতজানু পররাষ্ট্রনীতি পরিহারের ঘোষণা
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ একটি নতজানু ও নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতিতে আবদ্ধ ছিল। এনসিপি ক্ষমতায় এলে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে।
তিনি সার্ক পুনরুজ্জীবন, আসিয়ানে যোগদানের উদ্যোগ, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগের আমূল সংস্কার
নাহিদ ইসলাম বলেন, পুলিশ বাহিনীকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল। এনসিপি ক্ষমতায় এলে পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন করে একে জনগণের সেবায় নিয়োজিত একটি জননিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে।
একই সঙ্গে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবমুক্ত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
দ্রব্যমূল্য, কৃষি ও বাজার ব্যবস্থায় কঠোর অবস্থান
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং ভেজালবিরোধী শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণের কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
নারী, সংখ্যালঘু ও নাগরিক অধিকার
ভাষণে নারী অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনো আফগানিস্তান হবে না; বরং মালয়েশিয়া ও তুরস্কের মতো ভারসাম্যপূর্ণ, উদার ও ধর্মানুরাগী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
বিকেন্দ্রীকরণই ভবিষ্যৎ
নাহিদ ইসলাম বলেন, শক্তিশালী কেন্দ্র ভেঙে ক্ষমতা প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে হবে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশাসন, বিচার ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণের হাতে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়াই এনসিপির লক্ষ্য।
ভাষণের শেষাংশে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ইনসাফ, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার রাষ্ট্র গঠনে এনসিপিকে সুযোগ দিলে বাংলাদেশ একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।”











