নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ইনসাফভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে দলটি।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আসন্ন নির্বাচনে তিনিই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এটিই তার নেতৃত্বে বিএনপির প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। পরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো, বিএনপির শহীদ নেতাকর্মী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, রাশিয়াসহ ৩৮টি দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি, সিনিয়র সাংবাদিক, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

৫ ভাগে বিভক্ত ইশতেহার, ৯টি প্রতিশ্রুতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ইশতেহারে ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রত্যয় ঘোষণা করেছে। ইশতেহারের শ্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এতে মোট ৯টি প্রতিশ্রুতি, ৫টি ভাগে বিভক্ত কাঠামো এবং আগামী পাঁচ বছরের জন্য ৫১ দফার কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
ইশতেহারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন ও যুব উন্নয়নে ব্যাপক সংস্কার ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসী কার্ড চালু
যুবকদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি
বেকারভাতা চালু
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ
বিনামূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণ
গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার
ইশতেহারে বলা হয়, ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতায় একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ফ্যাসিবাদ ও বিদেশি আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি রোধ, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান
বিএনপি ঘোষণা করেছে, দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। উন্মুক্ত দরপত্র, রিয়েল টাইম অডিট, পারফরম্যান্স অডিট, সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স চালু এবং অর্থপাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারি তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা
ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিনিয়োগমুখী অর্থনীতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাত সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিক হাব, বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, আইসিটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্র
দারিদ্র্য নিরসনে মানবিক ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বিশেষ সুরক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হিসেবেও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সকল দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
ধর্মীয় বিষয়ে বিএনপি পুনর্ব্যক্ত করেছে— ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম
ইশতেহারে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও হয়রানি বন্ধের অঙ্গীকার করা হয়েছে। সাংবাদিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করা এবং জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি জানায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বয়েই এই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।











