ডেস্ক রিপোর্টঃ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় সংসদকে তিনি সকল যুক্তি, তর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ, ২০২৬) সকালে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলে শুরুতেই দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না ও হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটে আবারও একটি সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হলো।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের রাজনীতির এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মহান আল্লাহর দরবারে তিনি শুকরিয়া আদায় করছেন। তাঁর অশেষ রহমতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন যাত্রা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম পর্যন্ত গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রালগ্নে তিনি তাঁদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি আরও বলেন, এসব আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব মায়েরা সন্তান হারিয়েছেন, যেসব সন্তান তাঁদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে এবং যেসব আহত মানুষ স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন—তাঁদের অবদান জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্যাতন, নিপীড়ন, রাজনৈতিক হয়রানি কিংবা মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন—দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাহসী ভূমিকার ফলেই দেশে আবারও গণতন্ত্র ফিরে এসেছে।
তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই যাত্রালগ্নে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক বীর ছাত্র-জনতাকে অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশনেত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করে জাতীয় সংসদকে হাস্যরসের খোরাকে পরিণত করা হয় এবং দেশে তাঁবেদারি শাসন-শোষণ কায়েম করা হয়।
তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বেগম খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন এবং কখনো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি। কিন্তু দেশ ও জনগণের এই সাফল্যের মুহূর্তটি তিনি দেখে যেতে পারেননি। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি মরহুমা খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন—‘জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে আমি সেই দলেই আছি’। অর্থাৎ ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থই সবচেয়ে বড়—এটাই বিএনপির রাজনীতি।
তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো তিনি বিএনপি থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য এবং সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির রাজনীতি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতি। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করার মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি দেশের জনগণ ও জাতীয় সংসদের সব দলের নির্বাচিত সদস্যদের সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, দল বা মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাঁবেদারমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বাধীন, সার্বভৌম, নিরাপদ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়।
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না করে পূর্ববর্তী সরকার সংসদকে অকার্যকর করে ফেলেছিল।
তিনি বলেন, নতুন সংসদের যাত্রা শুরু করার সময় সাবেক স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও পতিত সরকারের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসরণ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন-এর নাম প্রস্তাব করেন।
তিনি বলেন, সংসদীয় রীতিনীতির ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতি নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ওই সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন এবং তার সভাপতিত্বে বাংলাদেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল।











